রোজায় পণ্যের দাম বাড়ার কারণ নেই

আসছে রমজান মাসে দেশে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কোনো কারণ নেই। রোজায় যেসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে, সেগুলোর আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। পাশাপাশি ওই সব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদরও নিম্নমুখী। ফলে ভোজ্য তেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর স্থিতিশীল থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে গুঁড়ো দুধ ও আদার দাম নিয়ে শঙ্কা আছে।
এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। রোজার আগ থেকেই এসব পণ্য বাজারে বিক্রি করবে টিসিবি। তাদের পণ্য তালিকায় থাকবে চিনি, মসুর ডাল, ভোজ্য তেল, ছোলা ও খেজুর।
তবে গুঁড়ো দুধ ও আদা নিয়ে এবার রোজায় চিন্তার কারণ রয়েছে। ইতিমধ্যে আদার দাম বেড়ে ১৫০-১৮০ টাকা হয়েছে। বিশ্ববাজারেও এ পণ্যটির দাম বাড়তি। রোজার আগে আন্তর্জাতিক বাজারদর না কমলে দেশের মানুষকে চড়া দরে আদা কিনে খেতে হতে পারে। দেশে গুঁড়ো দুধের দাম বেড়েছে। এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গুঁড়ো দুধের ৪০০ গ্রামের প্যাকেটের দাম ২০ টাকার মতো বেড়ে ২৬০-৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে খুচরা দোকানে।
ট্যারিফ কমিশনের গবেষণা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোটা দাগে বর্তমানে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক। আমদানি পরিস্থিতিও ভালো। বেশির ভাগ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার নিম্নমুখী আছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামী রোজায় বাজারদরে বড় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যাবে না।’
৩১ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে রোজার দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আগাম একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেল বিভিন্ন নিত্যপণ্যের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তুলে ধরে। ওই প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রোজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হওয়ার কারণ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দর নিম্নমুখী। পাশাপাশি বর্তমানে দেশের বাজারে এ দুটি পণ্যের দাম যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। প্রতিবছর রোজায় ভোজ্য তেল ও চিনি নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়, তা এ বছর হবে না বলেই মনে করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত জানুয়ারি থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে ৯০ হাজার টন সয়াবিন তেল ও দুই লাখ ২০ হাজার টন পাম তেলের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। এ সময়ে প্রায় তিন লাখ টন ভোজ্য তেল দেশে প্রবেশ করেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে প্রায় ৮৫ হাজার টন ভোজ্য তেল মজুদ রয়েছে।
ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশীয় মজুদ ও পাইপলাইন পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ট্যারিফ কমিশনের আরেকটি হিসাবে দেখা যায়, ৫ এপ্রিল পর্যন্ত আগের এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম কমেছে সাড়ে ৪ শতাংশ। পাশাপাশি বর্তমান দাম আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ কম। টিসিবির হিসাবে বর্তমানে ঢাকার বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৯৬ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ কম। বর্তমানে দেশের বাজারে চিনির দাম এত কমে গেছে যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন বিপুল পরিমাণ চিনি বিক্রি করতে পারছে না। মিলগেটে এখন প্রতি কেজি চিনি ৪০ টাকার নিচে নেমে গেছে। খুচরা বাজারে ৪২-৪৪ টাকা দরে মিলছে চিনি। ফলে সম্প্রতি সরকার চিনি আমদানিতে শুল্ক বাড়ালেও দামে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দর নিম্নমুখী এবং দেশে সরবরাহ স্বাভাবিক আছে।
গত ৬ এপ্রিল প্রতি টন পরিশোধিত চিনি আমদানি শুল্কের পরিমাণ এক হাজার ৫০০ টাকা বাড়িয়ে চার হাজার টাকা ও অপরিশোধিত চিনিতে ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এতে প্রতি কেজি অপরিশোধিত চিনিতে খরচ বাড়বে ৫০ পয়সা। তবে এর বিপরীতে গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম নিম্নমুখী বলে জানিয়েছে ট্যারিফ কমিশন।
জানুয়ারি থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত তিন লাখ ৫০ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে। এ সময় দেশে এসেছে তিন ৩১ হাজার টন। আমদানি ও পাইপলাইন পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে দাবি করেছে ট্যারিফ কমিশন। বর্তমানে রমজান মাস এমন সময় এসেছে, যখন দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ ভালো থাকে। বাজারে ও কৃষকের কাছে মজুদ ভালো থাকে। ফলে দাম তেমন একটা বাড়ে না। গত মৌসুমেও রোজা ও ঈদ শেষে পেঁয়াজের দাম বেড়েছিল, যা একসময় ১৫০ টাকা ছুঁয়েছিল। এবারও রোজায় পেঁয়াজের দাম ৪০ টাকার নিচে থাকবে বলে মনে করছেন রাজধানীর শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে মসুর ডাল, ছোলা, রসুন, খেজুর ও আদার সরবরাহ এবং আমদানি স্বাভাবিক আছে বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আদার দাম এখন একটু বেশি। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক।
এদিকে টিসিবি রোজা উপলক্ষে ১৫ হাজার টন চিনি, প্রায় ১০ হাজার টন মসুর ডাল, প্রায় ১০ হাজার টন ভোজ্য তেল, এক হাজার ৫০০ টন ছোলা ও ১৫০ টন খেজুর বাজারে বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পণ্যের কিছু অংশ তাদের হাতে এসেছে, কিছু পাইপলাইনে আছে। সুত্র