অপুষ্টিকে না বলার জন্য ধান

নেত্রকোনা জেলার এক গ্রামের শিশু বাচ্চু। প্রায়ই তার পেটের অসুখ হতো। সেইসঙ্গে তার রাতকানা রোগও ছিল। এক পর্যায়ে ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা দেখা দিলে তাকে গ্রামের ফার্মেসি থেকে কালো মেঘ নামের একটি ওষুধ এনে খেতে দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে সে সময় পানিশূন্যতার বিপদ এড়াতে তার দরকার ছিল পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি আর এক চিমটি লবণ। কিন্তু নিছক অজ্ঞতাবশত তাকে খেতে দেয়া হয় কালো মেঘ। অবশেষে নিদারুণ পানিশূন্যতায় ভুগে সে অকালে মারা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বার বার তার পেটের পীড়া ও রাতকানা রোগ দেখা দেয়ার মূল কারণ ছিল অপুষ্টি। গ্রামের মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম নিলেও তার বাবা-মাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সাধারণ স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিধান ভাল জানা না থাকায় তাকে পর্যাপ্ত জিংকসমৃদ্ধ খাবার বা জিংক সাপ্লিমেন্ট কোনোটাই খেতে দেয়া হয়নি। ফলে তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিল একেবারেই নাজুক। এসবের পরিণতিতেই সে অকালে প্রাণ হারায়।
বাচ্চু একা নয়। তার মতো অনেক শিশু রয়েছে যারা জিংকের অভাবজনিত কারণে মারাত্মক অপুষ্টির শিকার হয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে শতকরা ৪১ ভাগ শিশু রয়েছে যাদের শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি অপুষ্টির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ঘন ঘন পেটের পীড়া এবং রাতকানা রোগ শিশু অপুষ্টির অন্যতম প্রধান লক্ষণ। সন্তানসম্ভবা মায়েদেরও অনেকে অপুষ্টিজনিত নানা জটিলতার শিকার হন। জিংকসমৃদ্ধ খাবার অথবা জিংক সাপ্লিমেন্ট এ সমস্যা দূর করতে পারে।
জিংকের অভাবে যেসব শিশু ও মা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে তাদের জন্য একটি সুসংবাদ নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। এ প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত ব্রি ধান-৬২ মধ্যম মাত্রার জিংকসমৃদ্ধ। এতে জিংকের পরিমাণ প্রতি কেজিতে ১৯ মিলিগ্রাম। জিংকসমৃদ্ধ জাত হিসেবে গত বছর এটি বিশ্বে প্রথমবারের মতো অবমুক্ত করা হয়েছে। এ ধানের চালের ভাত খেলে শিশুসহ যেকোনো বয়সের মানুষের শরীরের জিংক ঘাটতি দূর হবে। জিংক মানব দেহের স্বাভাবিক গঠন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুবই কার্যকর। ব্রির মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস এবং সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান যদি দেশের গণমানুষের প্রধান খাদ্য চালের মাধ্যমে সরবরাহ করা যায় তাহলে সেটি নিশ্চিতভাবেই একটি বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে। অপুষ্টিকে না বলার সুযোগ তাহলে সকলের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। কেননা দেশে এখন আর যাই হোক, ভাতের অভাব নেই। ব্রি ধান-৬২ উদ্ভাবনের মাধ্যমে এক্ষেত্রে প্রাথমিক ভিত রচনার কাজটি বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে ব্রির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, তাদের হাতে আছে অধিকতর জিংক এবং ভিটামিন-এ উত্পাদনকারী বিটা ক্যারোটিনসমৃদ্ধ ধানের জাত। তবে এগুলো এখনো অবমুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে যা করা প্রয়োজন তা হলো, জিংকসমৃদ্ধ ধানের মানসম্পন্ন বীজ উত্পাদন করে তা সারাদেশে অনুকূল পরিবেশে চাষাবাদের জন্য ছড়িয়ে দেয়া। ব্রি, বিএডিসি এবং ডিএইসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে কাজ চালিয়ে গেলে এ ধানের চাষাবাদ সম্প্রসারণও বেশ দ্রুতই সম্পন্ন হতে পারে।
দেশের কৃষকরা এ জাতের ধান চাষে উত্সাহী হতে পারেন এজন্য যে, এটি আমন মৌসুমের সবচেয়ে আগাম জাত। এর গড় জীবনকাল মাত্র ১০০ দিন। আর শুধু মাঠের দিনগুলো বিবেচনায় নিলে এই জীবনকাল মাত্র ৮০ দিন বা তারও কম। সে হিসেবে তিন মাস বা তারও কম সময়ে এ ফসল ঘরে তোলা যায়। এ ধানের গড় ফলন হেক্টরে সাড়ে তিন টন হলেও অনুকূল পরিবেশে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এ ধান হেক্টরে সাড়ে পাঁচ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। অধিকন্তু এটি উচ্চ মাত্রার প্রোটিনসমৃদ্ধ জাত। এতে প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৯ ভাগ। জাতটির আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা মোকাবেলার জন্য সুপরিচিত ব্রি ধান-৩৩ এর চেয়েও এটি ১০-১২ দিন আগাম। ব্রি সূত্রে জানা যায়, আষাঢ়ের ১৫-২০ তারিখের মধ্যে এ জাতের বীজ বপন করে আশ্বিনের শেষ সপ্তাহে ধান কেটে আলু বা অন্য রবি শস্য চাষ করা যায়। সেদিক থেকে সময় এবং শস্য বিন্যাস বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, জাতটির চাষাবাদ দেশের কৃষকভাইদের জন্য বেশ লাভজনক হবে। যথাযথ প্রণোদনা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এর চাষাবাদ বিস্তৃত হলে তাদের জন্য এটি নতুন দিনের সূচনা করতে পারে।
লেখক : প্রযুক্তি সম্পাদক ও প্রধান, প্রকাশনা ও জনসংযোগ বিভাগ, ব্রি, গাজীপুর-১৭০১