শিক্ষায় অর্জন ॥ অনুকরণীয়!

০ সাক্ষরতা ৭০ শতাংশ
০ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় মাধ্যমিকে ছাত্রী সংখ্যা সর্বাধিক বাংলাদেশে
০ বিশ্বব্যাংক বলেছে আগামী ১০ বছরে সুফল পাওয়া যাবে
০ ২৭ লাখ শিশু স্কুল ফিডিং কর্মসূচীতে খাদ্য পাচ্ছে
 
বিভাস বাড়ৈ ॥ স্বাধীনতার ৪৩ বছরে দেশের অর্জন অনেক, তবে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রীতিমতো ঘটে গেছে বিপ্লব যা বিশ্বের বহু দেশের কাছে অনুকরণীয়। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ, ছাত্রছাত্রীর সমতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, ঝরে পড়ার হার দ্রুত কমে যাওয়াসহ শিক্ষার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে গেলেও শিক্ষার অগ্রগতিতে গত এক দশকই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সরকারী ভাষ্য, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, দেশী-বিদেশী গবেষণা প্রতিষ্ঠান আজ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একাত্তরে সাক্ষরতার হার যেখানে ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সেখানে এই হার এখন ৭০ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের নারী শিক্ষার হার ছিল বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম। ৮০ শতাংশ নারীই ছিল অশিক্ষিত। আজ শিক্ষিত ৫০ শতাংশেরও বেশি নারী। মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের শিক্ষা গ্রহণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন সবার ওপরে। দশ বছর আগে যেখানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল ৬১ শতাংশ, সেখানে এখন বিদ্যালয়মুখী শতভাগ শিশু। এই সময়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। 
দেশের শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা শিক্ষার ক্রমাবর্ধন অর্জনে সন্তোষ প্রকাশ করে বলছেন, এখন আর আগের অবস্থা নেই। গত কয়েক বছর বিশেষত গত মহাজোট সরকারের মেয়াদে সরকারীভাবে নেয়া শিক্ষা ব্যবস্থাপনাতেই এসেছে কিছুটা কঠোর তবে ইতিবাচক পরিবর্তন। এর ফলে প্রত্যেক শিক্ষার্থী বুঝতে পারছে বিদ্যালয়ে গেলেই লাভ আর না গেলে ক্ষতি। শিক্ষার বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন হয়েছে। এখন প্রত্যেক মা-বাবার লক্ষ্যই থাকে তাঁর সন্তানকে পড়ালেখা করাতে হবে। সন্তানও মনে করে ভালভাবে জীবনধারণ করতে হলে তাকে লেখাপড়া করতেই হবে। শিক্ষায় অর্জন অন্য যে কোন খাতের তুলনায় বেশি মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য কোন খাতে এত অর্জন নেই। শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক স্কুলে মোট ভর্তির হারে শতভাগসহ অন্য শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে ৬২ শতাংশ, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে ৪৪ এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। সংস্থাটি বলেছে, শিক্ষা খাতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শিক্ষার প্রায় ক্ষেত্রেই অভিগম্যতা ও সমতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে উপবৃত্তি। সংস্থাটির মতে, উপবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে অধিক সংখ্যায় নিম্ন আয়ভুক্ত পরিবারের শিশু ও মেয়েদের ভর্তির ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন অভিগম্যতা অর্জন করে ফেলেছে। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট ইতোমধ্যেই বলেছেন, শ্রমশক্তিতে তারুণ্যের প্রাধান্য বাড়ায় আগামী ১০ বছর বাড়তি সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। এ সুবিধা পেতে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে নতুন কৌশল নিতে হবে। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে কর্মমুখী উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ নারী-পুরুষ সমতাও অর্জন করেছে। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মেয়ে মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করতে পারে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এখন ছেলের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশি। মেয়েদের ক্ষেত্রে নেট ভর্তির হার ৪৪ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এ হার ৩২ থেকে ৪৫ শতাংশ হয়েছে। আগের চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী এখন স্কুলে টিকে থাকছে। গত ৩০ বছরে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা গড়ে যে কয়টি শ্রেণী অতিক্রম করতে পারে তার সংখ্যা বেড়েছে। এমনকি দরিদ্রদের ৫৭ শতাংশ ও সাধারণ পরিবারের শিশুদের ৮৩ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রতি ১০ জন প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মধ্যে মোটামুটি সাত থেকে আটজন পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত যেতে পারে। এর মধ্যে মাত্র তিন থেকে চারজন কোন শ্রেণীতে পুনরাবৃত্তি না করে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর গ-ি পেরিয়ে যেতে পারে। কেবল বিশ্বব্যাংক নয়, সকল হিসাবেই দেখা যায়, গত কয়েক বছরে শিক্ষার অগ্রগতির চিত্র। তবে এক্ষেত্রে প্রাথমিকের অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী একাত্তরে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ ভাগ। ’৭৪ সালে ছিল ২৫ ভাগ। ’৯১ সালে ৩৫ ভাগ, ২০০১ সালে ৪৭ দশমিক ৯ ভাগ, ২০০৩ সালে ৬৫ ভাগ, ২০০৮ সালে ৪৮ ভাগ, ২০০৯ সালে ৫৩ ভাগ এবং ২০১১ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশে। আর এখন এই হার ৭০ দশমিক ৭১ শতাংশ। শিক্ষা ব্যক্তির উন্নয়ন, সমাজের উন্নয়ন এবং দেশের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আর সেই শিক্ষার ভিত তৈরি করে প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতিতে বাংলাদেশ বিশ্বের মডেল দেশে পরিণত হয়েছে ইতোধ্যেই। বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা ব্যক্ত করে ইউনেস্কো ইতোমধ্যেই বলেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সমতা, বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে বই দেয়া, শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ইত্যাদি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে উদাহরণযোগ্য দেশে পরিণত করেছে। গত কয়েক বছর শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার বেশি তৎপর হলেও ১৯৯০ সালের পর থেকে সবার জন্য শিক্ষা, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন ও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কারণে সরকারকে এ সেক্টরে বিশেষ নজর দিতে হয়েছে। দেশকে নিরক্ষরতামুক্ত করতে, বিশেষত দরিদ্র পরিবারের ঝরে পড়া ছেলেমেয়েদের পুনরায় শিক্ষার ব্যবস্থা করতে এনজিওরাও এ সময় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। তাছাড়া এ সময়কালে বিদেশী সহায়তার সিংহভাগই প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের সফলতা ঈর্ষণীয় স্থানে পৌঁছেছে। অগ্রগতির চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল ৬১ শতাংশ। গত ৫ থেকে সাত বছর উপবৃত্তি আর স্কুল ফিডিং কর্মসূচীতে বিশেষ নজর দেয়ায় এখন বিদ্যালয়ে যাচ্ছে প্রায় শতভাগ শিশু। সারাদেশের ২৭ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী এখন স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম (এসএফপি) থেকে উপকৃত হচ্ছে। শিক্ষকরা বললেন, খাবারের বিশাল আয়োজন তা সত্যি নয়। তবে স্কুল ফিডিং কর্মসূচীর কারণে আজ দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার স্কুলের সব শিশুকেই নিয়মিত স্কুলে দেখা যায়। আগে অর্ধেকেরও বেশি শিশু স্কুলে ঠিকমতো আসত না আবার এলেও দুপুরের পর থাকত না। স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু হওয়ার পর শিশুরা ক্লাসে নিয়মিত হয়েছে। জানা গেছে, অনেকটা নীরবেই এই প্রকল্প রীতিমতো পাল্টে দিয়েছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র। সংশোধিত আকারে ২০১০ সাল থেকে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে স্কুল এলাকায় শিশুদের মাঝে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। যার ফলে শিশুরা দল বেঁধে প্রতিদিন স্কুলে আসছে। শিশুশিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষার হার ও গুণগত মান ঠিক রাখা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করার উদ্যোগকে সামনে রেখে সফলতার সঙ্গে কাজ চলছে দেশের ৭২টি উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৫শ’ ৭৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচীর আওতায় প্রতিদিন উচ্চ পুষ্টিমান সমৃদ্ধ এক প্যাকেট বিস্কুট পাচ্ছে ২৭ লাখ শিশুশিক্ষার্থী। বিশ্বখাদ্য কর্মসূচীসহ দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় রীতিমতো বিপ্লব সাধিত হচ্ছে স্কুল ফিডিং কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়নের কারণে। যার সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশ। নিশ্চিত হয়েছে- শিক্ষার্থীর শতভাগ ভর্তি, উপস্থিতির হার আগের তুলনায় গড়ে বেড়েছে ৫ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমেছে, শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, শিক্ষার গুণগত মান উন্নত হচ্ছে। সফলতার ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যেই কয়েকটি এলাকায় বিস্কুট বিতরণের পরিবর্তে পরীক্ষামূলক রান্না করা খাবার পরিবেশন কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়েছে। বিস্কুটের পরিবর্তে রান্না করা খাবার যদি সকল দিক থেকে বেশি সুফল বয়ে আনে তাতে সারাদেশের প্রকল্প এলাকায় পর্যায়ক্রমে নেয়া হবে একই রকমের উদ্যোগ। যদিও সরকারের সহায়তায় রাজধানীতে ৫টি স্কুলসহ দেশের স্বল্পসংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইতোমধ্যেই মডেল কর্মসূচী হিসেবে গরম খাবার পরিবেশন করছে কয়েকটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। প্রাথমিক শিক্ষায় যুগান্তকারী পরিবর্তনে সন্তুষ্ট বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর কর্মকর্তারাও। তাঁরা বলছিলেন, এই বিস্কুট শিশুদের কতটা কাজে আসছে, সেটা জানার জন্য ইন্টারন্যাশনাল ফুড রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও টাফট ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে একটি জরিপ চালায়। জরিপে দেখা গেছে, যেসব স্কুলে এই কর্মসূচী চলছে, সেখানে মোট ভর্তির হার বেড়েছে শতকরা ১৬ ভাগ, হাজিরা বেড়েছে ১৪ ভাগ, ঝরে পড়া কমেছে ১০ ভাগ, ফল ভাল হয়েছে ১৬ ভাগ, রক্তশূন্যতা কমেছে পাঁচ গুণ। কাজেই একটি বিষয়টি পরিষ্কার যে এই কর্মসূচী আসলেই সফল। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরেরর মহাপরিচালক শ্যামল কুমার ঘোষ বলছিলেন, দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচীর নামে যে প্রকল্প চলছে তার মূল উদ্দেশ্যই দরিদ্র শিশুদের স্কুলে আনা। কর্মসূচীতে খুশি সকলেই। 
আগে নারী শিক্ষা শুধু উচ্চবিত্ত ও শহরের কিছু পরিবারে সীমাবদ্ধ ছিল। এ ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছে সমাজ। মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের শিক্ষা গ্রহণে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন সবার ওপরে। কেবল এই দেশগুলোতেই নয়, বিশ্বের মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ যেখানে ৪৯ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ৫০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ৫২ শতাংশই ছাত্রী। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পসিংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যান রিপোর্টে দেশের শিক্ষার উন্নয়নের এই চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ক্রমেই কমছে। প্রাথমিকে হার কমছে। ২০০৫ সালে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার যেখানে ছিল ৮০ শতাংশেরও বেশি, সেখানে এই মুহূর্তে ঝরে পড়ার হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩ দশমিক ২৮ শতাংশে। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগ্রহণ এবং শিক্ষার ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে ব্যানবেইস সাবেক পরিচালক আহসান আবদুল্লাহ বলছিলেন, দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ১১৪টি। যদিও এ ছাড়া সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার বেশ কিছু কওমি মাদ্রাসা দেশে প্রতিষ্ঠিত আছে। সারাদেশের ১ লাখ ১৪ হাজার ১১৪ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছে ৩ কোটি ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৪৯১ জন শিক্ষার্থী, যা বিশ্বের বহু দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার বাড়ছে, কমছে ঝরে পড়ার হার। শিক্ষার সার্বিক চিত্রকে আশাব্যঞ্জক অভিহিত করে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরের দিকে তাকালে দেখা যাবে আমরা ক্রমেই ইতিবাচক অবস্থানে যাচ্ছি। আগানোর মাত্রা কম তবু তা আশাজাগার মতো। জানা গেছে, মাধ্যমিক স্তরে বিশ্বের মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ যেখানে ৪৯ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ৫০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ৫২ শতাংশই ছাত্রী। মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পর অবস্থান ভুটানের। এখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী হচ্ছে ৪৯ শতাংশ। এছাড়া মালদ্বীপ ও ইরান ৪৭, ভারত ৪৫, নেপাল ৪৩ এবং আফগানিস্তানে ছাত্রীর অংশগ্রহণ ৩১ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের নারীদের শিক্ষার চিত্র সম্পর্কে ব্যনবেইস জানিয়েছে, বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু আমরা এ দুটি দেশের এই চিত্রটি সংগ্রহ করতে পারিনি। গত কয়েক বছরের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বেড়েছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য পৃথক বোর্ড হয়েছে। বেড়েছে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর সংখ্যা। আইন পেশা শিক্ষার হারও বেড়েছে সমানতালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সারাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল চারটি। ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট। কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তখন ছিল না। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৪টি। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ৭৯টি। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিতেও বড় পরিবর্তন হয়েছে বিগত ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে। স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ। আর এই মুহূর্তে সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ২২ লাখের ওপরে। 
কবল কথার ফলুঝুরিতে মাতিয়ে না রেখে দেশের স্বার্থে একজন মন্ত্রী আন্তরিকতার সহিত কাজ করলে তার ফল যে পুরো জাতিকে আশাবাদী করে তুলতে পারে তার প্রমাণ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সহযোগিতায় দিনরাত কাজ করে পরিশ্রমী, সৎ ও ভাল মানুষ বলে পরিচিত এই রাজনীতিবিদ রীতিমতো জাগিয়ে তুলেছেন সঙ্কটকবলিত দেশের শিক্ষাকে। অন্যান্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে যখন নানাজনে নানা কথা বলছেন তখন শিক্ষা খাতের দুর্নীতি কমে ২৯ থেকে নেমে এসেছে ১৫ শতাংশে। জাতি পেয়েছে যুগোপযোগী এক শিক্ষানীতি। পাঠ্য বইয়ের বহুযুগের অরাজকতাকে সামলে ২৩ কোটি ২২ লাখ বিনামূল্যে নতুন বইয়ের বিতরণ তো এখন সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অবৈধ সুপারিশ ও তদবিরের বিরুদ্ধে শিক্ষামন্ত্রীর কঠোরতা পাল্টে দিয়েছে অনিয়মের চিত্রকে। বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করায় দুই বছরেরই শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার হার কমে এসেছে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিনামূল্যের পাঠ্যবই দিলেও, এ উদ্যোগ শিক্ষার সার্বিক চিত্রকেই পাল্টে দিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ২০১০ সালে ১৯ কোটি বই দিলেও চলতি বছর বিররণ করা হয় ৩১ কোটি বই। তার পরেও শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করাকেই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কারণ, গত ৩৮ বছরে কেবল একটি বা দুটি নয় পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য না হলেও প্রণীত হয়েছে প্রায় এক ডজন শিক্ষানীতি ও কমিশন। কিন্তু বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি একটিও। এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের পর প্রণীত ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের আলোকে ১৯৯৭ সালে ড. শামসুল হক শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু চারদলীয় জোট সরকারের আমলে রীতিমতো বাতিল করে দেয়া হয় এই শিক্ষানীতি। 
অবশেষে গত মহাজোট সরকার ওই শিক্ষানীতির আলোকেই দেশের শিক্ষা ব্যাবস্থায় আমূল পরিবর্তন করে প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি নেয়। একটি যুগোপযোগী নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নে সার্বিক সুপারিশ করার ক্ষমতা দিয়ে সরকার জাতীয় কমিটি গঠন করে ২০০৯ সালে। বহু প্রতীক্ষিত শিক্ষানীতি চূড়ান্ত হলো হয়। সর্বোচ্চ অর্জন শিক্ষাক্ষেত্রে- এমন মন্তব্য করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ একরামূল কবীর বলছিলেন, স্বাধীনতার পর আমাদের অর্জন অনেক। তবে অন্য কোন খাতে শিক্ষার মতো অর্জন নেই। শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে শিক্ষার গুণগত মানে কিছুটা উত্থান-পতন ঘটলেও বর্তমানে এই অবস্থার এখন পরিবর্তন ঘটেছে। ঝরে পড়ার হার অনেক কম। নারী শিক্ষার হার বেড়েছে সাফল্যজনকভাবে। এটি আমাদের বিশাল অর্জন। তিনি আরও বলছিলেন, এখন আর আগের অবস্থা নেই। গত কয়েক বছর বিশেষত গত মহাজোট সরকারের মেয়াদে সরকারিভাবে নেয়া শিক্ষা ব্যবস্থাপনাতেই এসেছে কিছুটা কঠোর, তবে ইতিবাচক পরিবর্তন। এখন প্রত্যেক মা-বাবার লক্ষ্যই থাকে তাঁর সন্তানকে পাড়ালেখা করাতে হবে। সন্তানও মনে করে ভালভাবে জীবনধারণ করতে হলে তাকে লেখাপড়া করতেই হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলছিলেন, শিক্ষায় আমাদের গত কয়েক বছর দেয়া উদ্যোগ পাল্টে দিয়েছে দেশের চিত্র। আজ আমার ডিজিটাল বাংলাদেশ দেখছি, সকলে আধুনিক প্রযুক্তি সস্পন্ন মানুষ হয়ে উঠছে এর সব কিছুই সম্ভব হয়েছে শিক্ষার উন্নয়ন হয়েছে বলেই। বলা হয় শিক্ষায় অর্জনের পেছনে বিগত মহাজোট সরকারের মেয়াদ থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ ও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মন্ত্রীর একাগ্রতা গত ৫ থেকে ৬ বছরেই পাল্টে দিয়েছে শিক্ষার চিত্র। শিক্ষামন্ত্রী বলছিলেন, আমি চাই সকলকে সঙ্গে নিয়ে আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতায় পরিপূর্ণ করে আমাদের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে। শিক্ষা হবে এমন শিক্ষা যা হবে জীবন সম্পৃক্ত ও দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ। লক্ষ্য সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যখন আমি এই দায়িত্ব নিয়েছিলাম তখনই এই দায়িত্বের কথা দেশের মানুষের কথা, আমাদের নতুন প্রজন্মকে পরিপূর্ণ মানুষ করার অঙ্গীকার করেছিলাম। তিনি জানান, অর্জন অনেক তা সত্যি, তবে এতেই আমরা সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকতে রাজি নই। এখন আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ মানসম্মত শিক্ষাদান নিশ্চিত করা। দেশের উন্নতির জন্য বিশ্বমানের শিক্ষার কোন বিকল্প নেই জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও নিরক্ষরতামুক্ত দেশ গড়াই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে বিশ্বমানের শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে না পারলে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়।