মাসে ৯০ লাখ মানুষ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা নেন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সরকারী স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও সেবা প্রদানের মাত্রার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। জনবল বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যু হ্রাস, ওষুধের সরবরাহ বৃদ্ধি, কমিউনিটি ক্লিনিক চালু, স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রম ইত্যাদি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। দেশের ৯৯ ভাগ উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা। বর্তমানে প্রতি মাসে ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা নেন। দেশে অনুর্ধ ১২ মাস বয়সের শিশুদের সকল টিকা প্রাপ্তির হার ৮১ ভাগ। হেলথ বুলেটিন ২০১৩ তে এসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। রবিবার এই বুলেটিনের মোড়ক উন্মোচন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।
রবিবার মন্ত্রণালয়ের কনফারেন্স কক্ষে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোঃ নুরুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। সম্মানিত অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন। হেলথ বুলেটিন-২০১৩ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন গত সরকারের আমলে স্বাস্থ্য সেক্টরে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমানেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এই সেক্টরের সকল অনিয়ম ও দুর্নীতি কঠোর হাতে দমন করা হচ্ছে। অবৈধ ও নিম্নমানের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। সীমিত সম্পদ হওয়ায় একটু ভেবেচিন্তে এগোতে হচ্ছে। মফস্বলে কর্মরত চিকিৎসকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারীদের ছাড় দেয়া হবে না বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, হেলথ বুলেটিন ২০১৩ শুধু স্বাস্থ্য নয়, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিসহ স্বাস্থ্য বলতে বৃহত্তর অর্থে বোঝানো হয়েছে। দেশের সর্বত্র যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে এই বুলেটিন সহায়ক ভূমিকা রাখবে। বুলেটিনের বিভিন্ন দিক উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, হেলথ বুলেটিন ২০১৩ এ মোট ২৬১ পৃষ্ঠায় ১৯টি বিষয়ভিত্তিক অধ্যায় এবং ১১টি অবশ্য পাঠ্য পরিশিষ্টে বিস্তারিতভাবে দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
পুষ্টি ও দারিদ্র্য-এমডিজি ১ ॥ হেলথ বুলেটিন ২০১২ ও ২০১৩ তে চিকিৎসক ও হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসক ও হাসপাতাল শয্যা অনুপাতের অবনতি হয়েছে। এ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে চিকিৎসক ও হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধিকে সমন্বিত করতে হবে। বুলেটিন ২০১২ এর তুলনায় বুলেটিন ২০১৩ তে দেশের চিকিৎসক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত চিকিৎসক, সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে রোগীর শয্যার সংখ্যা এবং প্রতি ১০ হাজার নাগরিকের জন্য চিকিৎসকের সংখ্যাও বেড়েছে।
স্বাস্থ্য বিষয়ক সহস্রাব্দ অর্জনে অগ্রগতি ॥ অনুর্ধ ৫ শিশুর কম ওজন হার ১৯৯০ সালের ৬৬ ভাগের তুলনায় হ্রাস পেয়ে ২০১১ সালে ৩৬.৪ ভাগে নেমে এসেছে। আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে কমিয়ে তা ৩৩ ভাগে আনতে হবে। অনুর্ধ ৫ শিশু মৃত্যুর হার ১৯৯০ সালের তুলনায় ৭১ ভাগ কমে এমডিজি ৪ অর্জিত হয়েছে। তবে নবজাতকের মৃত্যু হার অনুর্ধ ৫ শিশু মৃত্যু হারের ৫৯ ভাগ এবং অনুর্ধ ১ শিশু মৃত্যুর হারের ৮০ ভাগ, যা ধীরগতিতে কমছে। এ বিষয়টিতে নজর দিতে হবে। মাতৃ মৃত্যুর হার ১৯৯০ সালের প্রতি লাখে জীবিত জন্মে ৫৭৪ থেকে কমে ১৯৪ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৪৩ এ নামিয়ে আনার। প্রসূতি সেবা গ্রহণের হার এখনও আশানুরূপ নয়। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে প্রসব করানোর হারও কম। এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের নিম্ন হার বজায় রয়েছে। শতকরা ৪৫ ভাগ এইচআইভি আক্রান্ত মানুষ এআরভি পাচ্ছে। ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। দেশের শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষ নিরাপদ পানীয় জল পাচ্ছে এবং ৮০ ভাগ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা ॥ স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীন উপজেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত চালু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৫৬টি। রোগীর শয্যা সংখ্যা ১৮ হাজার ৭৮০। উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে ৪৩৬ হাসপাতাল। ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩১টি হাসপাতাল ও ১ হাজার ৩৬২টি আউটডোর ক্লিনিক রয়েছে। ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে ১২ হাজার ৫২৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মোট স্বাস্থ্য কেন্দ্র ১৪ হাজার ৪৮২টি। দেশের ৯৯ ভাগ উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা গ্রহীতার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা নেন। সেবা গ্রহীতাদের মধ্যে শিশু ও মহিলাই বেশি।
প্রসূতি স্বাস্থ্য পরিষেবা ॥ সরকারী বেসরকারী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো ১৯ লাখ ৬৫ হাজার প্রসব-পূর্ব সেবা দিয়েছে। সরকারী প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণকারীদের সংখ্যাই বেশি। এক্ষেত্রে সরকারী প্রতিষ্ঠানে ৬৭ ভাগ এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৩৭ ভাগ।
স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হাসপাতাল থেকে সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা ॥ সরকারী স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হাসপাতালগুলো থেকে সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। হেলথ বুলেটিন ২০১৩ অনুযায়ী ২০১২ সালে অন্য সব বছরের চেয়ে এ সব প্রতিষ্ঠানে বহির্বিভাগে শতকরা ২৩ ভাগ বেশি মানুষ সেবা নিয়েছে এবং ৫.৬ ভাগ বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। ২০১২ সালে বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছে ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৮১ হাজার ১১৫ জন মানুষ এবং ভর্তি হয়েছে ৪৫ লাখ ৬৪ হাজার ৩১৮ জন রোগী। বহির্বিভাগের রোগীদের ৮৪ ভাগ উপজেলা ও তদনিম্ন পর্যায় থেকে সেবা নিয়েছে। জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে ৭ ভাগ, মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতাল থেকে ৫ ভাগ, স্নাতকোত্তর হাসপাতাল থেকে ১ ভাগ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১ ভাগ সেবা নিয়েছে। সকল সরকারী হাসপাতাল শয্যার মাত্র ৪১ ভাগ উপজেলা ও তদনিম্ন হাসপাতালে রয়েছে।
শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবা ॥ দেশে অনুর্ধ ১২ মাস বয়সের শিশুদের সকল টিকা প্রাপ্তির হার ৮১ ভাগ। এক্ষেত্রে হাম ৮৫ ভাগ, ওপিভি ৯৩ ভাগ, বিসিজি ৯৯ ভাগ ও ডিপিট ৩/পেন্টা ৩ সফলতা পেয়েছে ৮৯ ভাগ। আইএমসিআই কর্মসূচীর আওতায় ৫৩ লাখ ৬০ হাজার শিশুকে বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা ॥ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বর্তমানে সরকারী হাসপাতালের সংখ্যা ৫৯৩টি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের রয়েছে ১২৬টি। এই দুটি স্তরে চালু রয়েছে ২৬ হাজার ৮৪১টি শয্যা। যা সরকারী শয্যার ৫৯ ভাগ। শয্যা সংখ্যা স্নাতকোত্তর হাসপাতাল পর্যায়ে ২ হাজার ৩শ’ মেডিক্যাল/ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল পর্যায়ে ১১ হাজার ৯৬০ এবং জেলা ও সদর হাসপাতাল পর্যায়ে রয়েছে ৯ হাজার ২০০টি।
সংক্রামক রোগী কমছে ॥ বর্তমানে মাত্র ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। এই জেলাগুলোতে গড়ে শতকরা ৩ ভাগ লোক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। শতকরা ৮০ ভাগ ম্যালেরিয়াই প্লাসমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম জীবাণুবাহিত। আর শতকরা ৮০ ভাগ ম্যালেরিয়া রোগীই রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায়। গত ২০০০ সালে প্রথম ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হলে ৫ হাজার ৫৫১ জন রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। সেই সময় মারা যায় ৯৭ জন। মৃত্যুর হার ছিল ১.৭ জন। গত ২০১২ সালে ৬৭১ জন রোগী শনাক্ত হয়। তখন মারা যায় মাত্র ১ জন। দেশের ৩৪টি জেলায় ফাইলেরিয়া আছে। ড্রাগ প্রয়োগের ফলে এই জেলাগুলোতে প্রাদুর্ভাব শূন্য থেকে ১ ভাগে নেমে এসেছে। ২০১২ সালে মাত্র ১০৩ জন এইডস রোগী শনাক্ত হয়।
অসংক্রামক ব্যাধি বাড়ছে ॥ বর্তমানে সকল রোগের শতকরা ৬১ ভাগ সংক্রামক ব্যাধি। প্রতি ৫শ’ শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু অটিস্টিক। ভেজাল খাদ্য অভিযানে তৎপর ছিল সরকার। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ২০১২ সালে ৫ হাজার ৩২২টি খাবারের নমুনা পরীক্ষা করেছে। সেগুলোর মধ্যে শতকরা ৪৯ ভাগ নমুনাতেই ভেজাল পাওয়া গেছে।