বাংলার ‘সোলার গাড়ি’

 

জুলাইয়ে ভারতের পাঞ্জাবে হবে ‘ইলেকট্রিক সোলার ভেহিকল চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৪’। ‘গ্রিন ইভেন্ট ফর গ্রিন ফিউচার’ স্লোগানের এই প্রতিযোগিতার শর্ত হচ্ছে মাত্র ৭৫ হাজার টাকার মধ্যে একটি পরিপূর্ণ সোলার গাড়ি তৈরি করা। সেই শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ থেকে অংশ নিচ্ছেন একদল প্রকৌশল শিক্ষার্থী। তাঁদের দলের নাম ‘সান রাশ’
গাড়ি পোষা চাট্টিখানি কথা নয়। চড়া মূল্য দিয়ে কেনার পর নিত্য খরচ হিসেবে লেগে থাকে তেল বা গ্যাস খরচ। সারাইয়ের খরচাপাতি তো আছেই। সঙ্গে বাড়তি পাওনা (!) পরিবেশের ক্ষতি। এসব চিন্তা থেকেই বিশ্বের অনেক দেশ নেমেছে পরিবেশবান্ধব গাড়ি তৈরির কাজে। চলছে সোলার গাড়ি নিয়ে গবেষণা। এই কাজে এগিয়ে এলেন বাংলাদেশের একদল প্রকৌশল শিক্ষার্থীও। তাঁরা তৈরি করেছেন দেশের প্রথম চার চাকার সোলার বা সৌরবিদ্যুৎচালিত গাড়ি। পরিবেশবান্ধব এই গাড়ি চালাতে খরচও হবে অনেক কম।
সান রাশ শুরুর গল্প
গাড়ি তৈরির পেছনের গল্প জানালেন দলের অন্যতম সদস্য ফরহাদ হোসেন শুভ। বললেন, ‘ইলেকট্রিক সোলার ভেহিকল চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৪’ প্রতিযোগিতার শর্ত অনুযায়ী, গাড়ি চলতে হবে সূর্যের আলোতে। হতে হবে পরিবেশবান্ধব। দুই ধাপ পার হয়ে টিমকে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিতে হবে। আর সেই প্রতিযোগিতার মানদণ্ড বজায় রেখেই সম্পূর্ণ সোলারভিত্তিক বৈদ্যুতিক গাড়ি বানিয়েছে সান রাশ।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় লাগল কেমন বা কী কী প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে জানতে চাইলে সান রাশ দলের নকশাবিদ জাবিদ ইশতিয়াক বলেন, ‘বাজার ঘুরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি একত্র করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মনমতো না পাওয়ায় গাড়ির নকশায় পুরো পরিকল্পনা কাজে লাগানো যায়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ ধরনের কারিগরি কাজ দেরিতে হলেও শুরু হচ্ছে দেশে। তবে সীমাবদ্ধতা পিছু ছাড়ছে না। বাইরের দেশে যেখানে অনেক হিসাব-নিকাশ করে আগে গাড়ির নকশা করা হয়, সেখানে আমরা আগে খোঁজ করেছি দেশে কোন কোন যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়। সেই ভিত্তিতে নকশা করা হয়েছে গাড়িটির।’
সান রাশ টিম
২০ জনের বড়সড় একটি দল নিয়ে গাড়ি তৈরির কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন শাহরিয়ার মাহমুদ। সহযোগীদের প্রায় সবাই মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। দুজন আছেন তড়িৎকৌশল বিভাগের। তারুণ্যে ভরপুর এই টিমের নাম ‘সান রাশ’। শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক নাজিয়া বিনতে মুনির ও আবু রায়হান মোহাম্মদ সিদ্দিক। যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রধান কর্নেল মো. লুৎফর রহমান দলের পরামর্শক।
এই প্রথম
বাংলাদেশে এর আগে সৌরচালিত শখের যানবাহন তৈরি হলেও পূর্ণাঙ্গ গাড়ি এই প্রথম। এর বিশেষত্ব কী জানতে চাইলে সান রাশের সদস্যরা জানান, এটি সাধারণ গাড়ির মতোই সড়কগুলোতে চলবে। গাড়িটি লম্বায় ৯ ফুট ও চওড়ায় ৪.৬ ফুট। উচ্চতা ৪ ফুট ৭ ইঞ্চি, ওজন ১৪০ কেজি। নির্মাতাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল, যত বেশি সম্ভব কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করা। সরাসরি সূর্যের আলো না পেলে সাধারণত সোলার প্যানেলের শক্তি কমে যায়। এ সমস্যার সমাধানে প্যানেলগুলো ঘূর্ণনযোগ্য করে তৈরি করা হয়েছে। এতে সূর্যের আলোর দিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুরে যাবে প্যানেলগুলো। প্যানেলের সংখ্যা চারটি, প্রতিটির ক্ষমতা ১৫০ ওয়াট করে মোট ৬০০ ওয়াট।
গাড়িটি বর্তমানে ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। তবে এই ক্ষমতা আরো বাড়ানোর কাজ চলছে। গাড়ি স্থির হয়ে থাকার সময় এটিতে থাকা ব্যাটারির চার্জ হয়। ব্যাটারি ৪৮ ভোল্টের। তবে গতিশীল অবস্থায় গাড়িটি ব্যাটারির ওপর নির্ভর করে না। তখন সূর্যের আলোকশক্তি সোলার প্যানেল দিয়ে সরাসরি গাড়ির মোটরে পৌঁছে যায়। ৬০০ ওয়াটের একটি ডিসি মোটরই এর ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে। এ জন্য একে সাধারণ ইলেকট্রিক গাড়ি না বলে একটি পরিপূর্ণ সোলার গাড়ি বলাই ঠিক হবে।
লক্ষ্য আরো বেশি
শুধু প্রতিযোগিতাই নয়, তার চেয়ে বড় লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগোচ্ছেন নির্মাতারা। তাঁরা জানান, বাংলাদেশের জন্য উপযোগী গাড়ি হতে পারে এটি। চাইলে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনও করা যেতে পারে। আপাতত এতে একটি আসন থাকলেও করা যাবে চার আসন। এর ফলে ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হবে এটি।