দেশে প্রথম ‘বোনম্যারো প্রতিস্থাপন’ চিকিৎসায় ॥ মাইলফলক

০ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২-এ অপারেশনের মাধ্যমে নতুন অধ্যায় শুরু ০ দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক এমএ খান ও বিমলাংশু দের নেতৃত্বে একদল ডাক্তার

দেশে প্রথম অস্থিমজ্জার (বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন) সফল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চিকিৎসাক্ষেত্রে মাইলফলক সৃষ্টি করলেন চিকিৎসকরা। সোমবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক এমএ খান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ডা. বিমলাংশু দের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী এ অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। পরে বিকেলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, সফলভাবে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক স্থাপিত হলো।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২ এর বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনস ইউনিটে এ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. জাহেদ মালেক, স্বাস্থ্যসচিব এসএম নিয়াজ উদ্দিন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দ্বীন মোহাম্মদ নুরুল হক। এ সময় কথা বলেন চিকিৎসকরাও। যে রোগীর বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন করা হয়েছে সর্বপ্রথম মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে তার আশু রোগমুক্তি প্রার্থনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, রোগীর প্রাইভেসির কথা বিবেচনায় রেখে আমরা জানাতে চাই ‘মাল্টিপল মায়োলোমা’ নামক ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ৫২ বছর বয়সী একজন পুরুষের দেহে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন করা হয়েছে। রোগী একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। ‘বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন’ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান মোহাম্মদ নাসিম। রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে সংবাদ সম্মেলনে রোগীর নাম পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। মন্ত্রী বলেন, ব্লাড ক্যান্সার একটি প্রাণঘাতী রোগ। আমাদের দেশেও অনেক মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে যত ধরনের ক্যান্সার রয়েছে তার শতকরা ১১ দশমিক শূন্য ৪ ভাগ ব্লাড ক্যান্সারই অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য। তবে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা। যেখানে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা নেই, সেখানে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী ও তার আত্মীয়স্বজনদের অসহায়ত্ব নিদারুণ। সামর্থ্য থাকলে বাংলাদেশের ব্লাড ক্যান্সার রোগীরা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের জন্য দেশের বাইরে যেয়ে থাকেন। একবার গেলে হয় না, বার বার যাতায়াত করতে হয়। প্রতিবছর রোগীপ্রতি খরচ হয় ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা। যাদের দেশের বাইরে চিকিৎসা নেয়ার সামর্থ্য নেই তাদের কেমোথেরাপি দেয়া হয় এবং এটা সাময়িক এবং অচিরেই তাদের মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। তাই ব্লাড ক্যান্সার এক মহা আতঙ্কের নাম। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে যাতে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা যায় সে জন্য মহাজোট সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নবনির্মিত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২ এর দেশে প্রথম অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ইউনিট প্রতিষ্ঠার সেই প্রচেষ্টার একটি সফল অধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ৫ বছরে স্বাস্থ্যখাতে যে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে, অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ইউনিট তার একটি উজ্জ্বল মাইলফলক। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আজ বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক স্থাপিত হলো। মন্ত্রী জানান, এ ট্রান্সপ্লান্টেশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশের হেমাটলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএ খান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. বিমলাংশু দের নেতৃত্বাধীন একটি সমন্বিত চিকিৎসক দল।

শুধু আজকের ট্রান্সপ্লান্টেশন সম্পাদন নয়, এ কর্মসূচীতে শুরু থেকে আমাদের সাথী হয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্টের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, নার্স, টেকনোলজিস্ট সমন্বিত একটি হৃদয়বান দল এবং গ্লোবাল হেলথ নামক একটি বিশ্বখ্যাত দাতা সংস্থা। তাদের অবদান বাঙালী জাতির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন বিষয়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে এ বিষয়ে সহযোগিতাকারী মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানাই ধন্যবাদ। মন্ত্রী বলেন, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের মতো একটি জীবাণুনিরোধক প্রযুক্তি ও বিবিধ অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। আশা করছি, বাংলাদেশের ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের দুর্দিন বিদায় হলো। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নয়, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা নিজ দেশেই নতুন জীবন লাভ করতে পারবেন। স্বদেশের মাটিতেই সহজে সুলভে এখন থেকে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন। এ ছাড়া স্টেম সেলসংক্রান্ত অন্যান্য চিকিৎসার পথও অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন সুগম করবে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. বিমলাংশু দে বলেন, এই বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিজ্ঞ টিমের সঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হেমাটোলজি বিভাগের ডাক্তার, নার্সরা হাতেকলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। এ দেশে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের মধ্য দিয়ে ধনী লোকের এই রোগের জন্য আর বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। তাঁরা কম খরচে এ দেশেই হাতের কাছে অত্যাধুনিক চিকিৎসা পাবেন। তাঁদের টাকা দিয়েই দরিদ্র রোগীদের এ চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, তিন বছর ধরে বাংলাদেশে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। বাংলাদেশের চিকিৎসক ও তাঁদের সহযোগীরা তিন বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নানা প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। মার্কিন বিশেষজ্ঞ দলও একাধিকবার বাংলাদেশে এসেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এই ইউনিটটি যে কোন বিবেচনায় বিশ্বের যে কোন শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনীয়। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এই মার্কিন চিকিৎসক বাংলাদেশে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে অব্যাহতভাবে সহযোগিতা করার বিষয়ে তিনি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।