প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত

আরেক ধাপ উন্নীত সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেলও ॥ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় শিক্ষকদের কৃতজ্ঞতা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করেছে সরকার। সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেলও উন্নীত করা হয়েছে এক ধাপ। রবিবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের উদ্বোধন করে প্রাথমিক শিক্ষক সমাজের বহু বছরের এ দাবি পূরণের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘোষণার দিন অর্থাৎ রবিবার থেকেই শিক্ষকরা এই সুযোগ-সুবিধা পাবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ৬৩ হাজার ৪৬৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চার লাখ ৬০ হাজার শিক্ষকের পদমর্যাদার সঙ্গে বেতন-ভাতাতেও উন্নতি হলো। সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার ছেলে চাই। আর সেই সোনার বাংলা গড়ার কারিগর আপনারা। কাজেই আপনারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবেন, যেন বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আর সত্যিকার সোনার ছেলেদের হাতে যেন দায়িত্ব দিতে পারি। এই ধাপটা এখন করলাম। আমার আরও ইচ্ছা আছে। তা হয়ত পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা করব। সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা।

‘শিক্ষাই জীবনের মূল, ঝরে পড়া বিরাট ভুল’ সেøাগান সামনে রেখে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে এবারের শিক্ষা সপ্তাহ। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ অনুষ্ঠানেই তিনি শিক্ষকদের দাবি পূরণের ঘোষণা দেন। এর পরই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে বলা হয়, ৯ মার্চ থেকেই শিক্ষকরা এই সুযোগ-সুবিধা পাবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের মূল বেতন হবে ৬ হাজার ৪০০ টাকা (গ্রেড-১১)। এতদিন তারা পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা মূল বেতন পাচ্ছিলেন। আর প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের মূল বেতন হবে পাঁচ হাজার ৯০০ (গ্রেড-১২) টাকা। আগে ছিল পাঁচ হাজার ২০০ টাকা। সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীত করার ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মূল বেতন চার হাজার ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে পাঁচ হাজার ২০০ টাকা (গ্রেড-১৪) এবং প্রশিক্ষণবিহীনদের চার হাজার ৭০০ থেকে বেড়ে চার হাজার ৯০০ টাকা (গ্রেড ১৫) হবে। গত ২৬ নবেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারী প্রাথমিকের শিক্ষকদের বেতন স্কেল, গ্রেড ও শ্রেণী উন্নীতকরণে সম্মতি দেয়। এর পর প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে ওই প্রস্তাব অনুমোদন পায়। রবিবার প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার বলেন, আজ শিক্ষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী একটি ঘোষণা দেবেন। এর পরই প্রধানমন্ত্রী পরে তার বক্তৃতায় বলেন, শিক্ষকদের সমস্যাগুলো আমাদের জানা আছে। ইতোমধ্যে কিছু কিছু সমাধান করার উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা তৃতীয় শ্রেণী থেকে আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করেছি। এ সময় উপস্থিত শিক্ষকরা করতালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার ছেলে চাই। আর সেই সোনার বাংলা গড়ার কারিগর আপনারা। কাজেই আপনারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবেন, যেন বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আর সত্যিকার সোনার ছেলেদের হাতে যেন দায়িত্ব দিতে পারি। শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এই ধাপটা এখন করলাম। আমার আরও ইচ্ছা আছে। তা হয়ত পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা করব। এ জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হওয়া। শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা যাতে শিক্ষকতা পেশাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেÑ সে জন্যই এ উদ্যোগ আমরা নিচ্ছি।

এ অনুষ্ঠানেই প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য সমাপনী পরীক্ষায় ভাল ফলকারী ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি খেলাধুলা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে বিজয়ীদের এবং শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে শিক্ষার মান উন্নয়নে স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারের গুরুত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের শিক্ষা খাতকে আমরা ঢেলে সাজিয়েছি। আমরা একটি উৎপাদনমুখী, বিজ্ঞানসম্মত ও যুগোপযোগী জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছি। বছরের প্রথম দিনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের হাতে দিতে পারছি বিনামূল্যে নতুন বই। আমরা আরেকটি পদ্ধতি নিতে যাচ্ছি তা হলো- প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা। এ জন্য দেড় কোটি বই তৈরি করে রেখেছি। যেটা আমরা ছোট ছোট শিশুদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছি। যাতে তারা স্কুলে যাওয়ার আগেই কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। শেখ হাসিনা বলেন, সরকারের পর্যাপ্ত অর্থ থাকলে সবার শিক্ষা অবৈতনিক করে দেয়ার ইচ্ছা তার ছিল। কিন্তু সকলের দায়িত্ব এভাবে সরকারের পক্ষে নেয়া এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। তারপরও প্রতিবছর প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৭৯ লাখ, মাধ্যমিকে ৪০ লাখ এবং উচ্চ মাধ্যমিক থেকে ডিগ্রী পর্যন্ত এক লাখ ৩৩ হাজার শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চেষ্টা করছি। একদিকে বিনামূল্যে বই বিতরণ, আরেকদিকে উপবৃত্তি দিয়ে যাচ্ছি। সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা চালু করায় শিক্ষার্থীরা ‘পরীক্ষাভীতি’ কাটিয়ে উঠছে এবং ফল ভাল হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে কম্পিউটার শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দেশকে ডিজিটাইজড করার জন্যই এটা করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই এটা শুরু করতে হবে। ইতোমধ্যেই আমরা গ্রাম পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিয়েছি। এ লক্ষ্যে আরও কাজ হচ্ছে। বিএনপি সরকারের আমলে শিক্ষা খাতে একটা স্থবিরতা নেমে এসেছিল। আমরা ক্ষমতায় আসার পর এ খাতের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মসূচীতে সহিংসতার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, স্কুলে যাওয়ার পথে ককটেল মেরে আহত করেছে চট্টগ্রামের স্কুলছাত্রী অন্তু বড়ুয়া, সাভারের ক্লাস ফোরের শিশু ছাত্রী বিনু ও বগুড়ার সাদিয়া আক্তারকে। নির্বাচন বানচাল করতে ৫৮২টি স্কুল ভাংচুর করেছে, পুড়িয়ে দিয়েছে। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে তাদের বাধা দেয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রাথমিক শিক্ষা সচিব কাজী আখতার হোসেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক শ্যামল কান্তি ঘোষ প্রমুখ।

শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা ও বেতন ভাতা বৃদ্ধি করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা সরকারকে অভিনন্দন জানান। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন সংগঠনের সভাপতি মোঃ আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ায় ইতোমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাকি যেসব সমস্যা আছে তাও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের চাকরি দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত এবং সহকারী শিক্ষকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আশা করছি এতে প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হবে। এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ গ্র্যাজুয়েট প্রাথমিক শিক্ষক সীমিত। সারাদেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ শুরু হয়েছে। চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। নীলফামারীতে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের আয়োজনে শহরের শিল্পকলা অডিটোরিয়াম থেকে র‌্যালি বের হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়। এতে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। মেহেরপুরে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের কর্মসূচী। সকালে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের উদ্যোগে জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে এ উপলক্ষে একটি র‌্যালি বের হয়। এ উপলক্ষে রাঙ্গামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নেত্রকোনায় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ শুরু হয়েছে আলোচনা শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক ড. আবুল কালাম আজাদ। দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলায় জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে। উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে প্রথম দিনে একটি র‌্যালি বের হয়। র‌্যালিটি উপজেলা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে হাকিমপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের আয়োজনে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। রাজবাড়ীতে এ উপলক্ষে আলোচনাসভা ও র‌্যালির আয়োজন করা হয়েছে। র‌্যালি ও আলোচনাসভার মধ্য দিয়ে ভোলায় জাতীয় শুরু হয়েছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ। কুষ্টিয়ায় জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের উদ্যোগে কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরী মাঠ থেকে র‌্যালিটি বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ শেষে কুষ্টিয়া পৌরসভা বিজয় উল্লাস চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। র‌্যালিতে স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন।