ডিজিটাল মানচিত্রে বাংলাদেশ

 

ম্যাপিং-এ মগ্ন এক স্বেচ্ছাসেবক।ছবি: ম্যাপিং বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ডিজিটাল মানচিত্র উন্নয়নে কাজ করছে ‘ম্যাপিং বাংলাদেশ’। গুগল ম্যাপ মেকারের এই আঞ্চলিক দলের সহস্রাধিক স্বেচ্ছাসেবী দেশের বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনাকে অনলাইনে যোগ করছে। জানাচ্ছেন তুহিন মাহমুদ

ব্যক্তিগতভাবে গুগল ম্যাপে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ভবন, সড়ক, নদীসহ বিভিন্ন স্থানকে যুক্ত করে আসছিলেন বাংলাদেশের ম্যাপাররা। ২০১২ সালে দেশের এমনই কিছুসংখ্যক ম্যাপারকে আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ (আরইআর) হিসেবে নির্বাচিত করে গুগল। এরপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ম্যাপারদের সংগঠিত করতে উদ্যোগ নেন আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলমগীর, আলতাফ-উজ-জামান ও তানজিমুল ইসলাম তানজিল। সে ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে ‘ম্যাপিং বাংলাদেশ’। এরপর থেকে এই কমিউনিটির মাধ্যমে সারা দেশে ম্যাপার তৈরি ও দেশের ম্যাপ ডিজিটালাইজেশনের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রয়োজনীয়তা

বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি খাতে গুগল ম্যাপ ব্যবহৃত হচ্ছে প্রতিনিয়তই। গ্রামীণফোন, বাংলালায়নসহ দেশের নানা প্রতিষ্ঠান স্থাননির্ভর ফিচারের ক্ষেত্রে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। বাদ পড়ছে না বেসরকারি টেলিভিশন, পত্রিকা এবং অনলাইন পোর্টালগুলোও। সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ চালু করেছে গুগল ম্যাপনির্ভর ‘ক্রাইম ম্যাপ’।

বাংলাদেশে গুগল ম্যাপকে সমৃদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে ম্যাপমেকারের কান্ট্রি অ্যাডভোকেট আলতাফ-উজ-জামান বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে যদি ম্যাপমেকারের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে বাংলাদেশের মানচিত্রকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারি, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে গুগল ম্যাপে নেভিগেটর ও লাইভ ট্রাফিক সুবিধা পাওয়া যাবে। আগ্রহীরা কমিউনিটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (www.mappingbd.org) থেকে কমিউনিটিতে যোগ দিয়ে গুগল ম্যাপে অবদান রাখতে পারবে।’

পরিচালনা

বাংলাদেশে গুগল ম্যাপারদের কার্যক্রম সম্পর্কে কমিউনিটির প্রধান নির্বাহী হাসান শাহেদ জানান, কমিউনিটির সব কার্যক্রম দুটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নির্বাহী কমিটি দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন এবং ম্যাপারদের সমন্বয়ের কাজ করে। অন্যদিকে সুপ্রিম কমিটি নীতিনির্ধারণ ও পরামর্শের দায়িত্ব পালন করে।

এগিয়ে চলা

বাংলাদেশের যে গুগল ম্যাপ দৃশ্যমান তার নেপথ্যে এই কমিউনিটি।

ম্যাপ আপ ও অনলাইন কার্যক্রমের মাধ্যমে সুদক্ষ ম্যাপার তৈরি, নতুন ম্যাপারদের শিক্ষাদান, বাদ পড়া সুবিধা ম্যাপে সংযোজন করে দেশের মানচিত্র সমৃদ্ধ করছে এই দল। ৬৪ জেলার এক হাজারের বেশি সদস্য ডিজিটাল মানচিত্র প্রণয়নে অবদান রাখছে। www.mappingbd.org-এর মাধ্যমে নতুনদের ম্যাপিং শেখানোর বিভিন্ন টিউটরিয়াল ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে ভারতের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত ‘এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল কনফারেন্স’-এ কমিউনিটির পক্ষে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন আলতাফ-উজ-জামান। গত বছরের জানুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘স্মার্টফোন এক্সপো’-তে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে বিনা মূল্যে স্টল বরাদ্দ পায় ম্যাপিং বাংলাদেশ। সেখানে প্রযুক্তিপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয় সংগঠনটি। দর্শনার্থীরা ম্যাপিং সম্পর্কিত নানা তথ্য জানতে পারেন স্টল থেকে। একই বছর জুনে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত ‘গুগল সার্চ সামিট’-এ কমিউনিটির হয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন হাসান শাহেদ ও অভিজিত রায়।

বাংলাদেশে গুগল ম্যাপসের সম্ভাবনা বিষয়ে অভিজিত রায় জানান, ‘দেশে ও বিদেশের নানা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে ম্যাপিং বাংলাদেশ।

সবার প্রচেষ্টায় সমৃদ্ধ মানচিত্র তৈরি সম্ভব হলে উন্নত দেশের মতো এ দেশেও লাইভ ট্রাফিকসহ নানা সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’-এর সময়ে ‘ক্রাইসিস ম্যাপিং’ তৈরি করে ম্যাপিং বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ মশিউর রহমান মাসুদ বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় উপকূলীয় জেলাগুলোতে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান গুগল ম্যাপে যোগ করে প্রশাসন ও দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ওই সব স্থান ম্যাপে খুঁজে দ্রুত ত্রাণসামগ্রী ও অন্যান্য সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়।

নিয়মিত গুগল ম্যাপআপ আয়োজন

ম্যাপারদের প্রশিক্ষিত করতে নিয়মিত ‘গুগল ম্যাপআপ’-এর আয়োজন করে কমিউনিটি। ২০১২-তে রংপুর ম্যাপআপের মাধ্যমে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে গুগলের এই আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি। গত বছর রাজধানীর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউআইইউ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ম্যাপআপ আয়োজিত হয়। ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, খুলনা, চট্টগ্রাম এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ম্যাপআপ’ কার্যক্রম পরিচালনা করে কমিউনিটি।

কমিউনিটির অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী ব্যবস্থাপক তানজিমুল ইসলাম তানজিল জানান, ‘পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪ জেলায় ম্যাপআপের মাধ্যমে গুগল ম্যাপ উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

ইতিমধ্যে দেশের প্রতিটি জেলা থেকে একজন করে প্রতিনিধি মনোনয়নের মাধ্যমে জেলাভিত্তিক কর্মকাণ্ড প্রসারের কাজ করছে কমিউনিটি।