ওষুধ রফতানিতে আয় বাড়ছে

স্থানীয় বাজারে বছরে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা

প্রতি বছরই ওষুধ রফতানি করে আয় বাড়ছে। দেশের ওষুধের চাহিদার ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ মেটানোর পর বিশ্বের ৮৭ দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ওষুধের বাজার বছরে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০১৫ সালের মধ্যে ১৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব বলে মনে করছেন ওষুধ ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, প্রস্তাবিত ওষুধনীতি বাস্তবায়িত হলে ওষুধ শিল্প আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ডিসেম্বর পর্যন্ত রফতানি হয়েছে ৩ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের ওষুধ। ২০১১-১২ অর্থবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৪ কোটি ৮২ লাখ ডলারের ওষুধ রফতানি হয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়ে ৫ কোটি ৯৮ লাখ ডলারে পৌঁছে। ভিয়েতনামে সবচেয়ে বেশি ওষুধ রফতানি হয়। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৬৫-৭০ লাখ ডলারের ওষুধ রফতানি হয়। ওষুধজাত অন্য পণ্যও রফতানি হয় দেশটিতে। এ ছাড়া মালদ্বীপে ওষুধ রফতানি হয় বছরে প্রায় ১ লাখ ডলারের। এ ছাড়া যে সব দেশে ওষুধ রফতানি হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আফগানিস্তান, অস্ট্রিয়া, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ভুটান, ব্রাজিল, কম্বোডিয়া, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, চিলি, সেন্ট্রাল আমেরিকা, ডেনমার্ক, মিসর, ফিজি, ড্যাম্বিয়া, জার্মানি, ঘানা, গুয়েতামালা, হুন্ডুরাস, হংকং, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জাপান, জর্ডান, কেনিয়া, কোরিয়া, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মঙ্গোলিয়া, মরিশাস, মেক্সিকো, মিয়ানমার, নিকারাগুয়া, নেদারল্যান্ডস।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোক্তাদির জনকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ আন্তর্জাতিক সাধারণ মানকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় রফতানি চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। তবে প্রস্তাবিত ওষুধনীতি বাস্তবায়িত হলে ওষুধ শিল্প আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বলে মনে করেন তিনি। আবদুল মোক্তাদির জানান, গত বছর বিরোধী দলের টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে অন্য শিল্প খাতের মতো ওষুধ শিল্প আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই সময়ে বিদেশে ওষুধ রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ ও ঋণের শ্রেণীকরণের বর্তমান ব্যবস্থা স্থগিত রাখার দাবি জানান তিনি।

ইপিবির দেয়া তথ্য মতে, ২০০১ সালে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বাজার ছিল ১৭টি দেশে। মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে এ বাজার বিশ্বের ৮৭টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৩০০ ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠান এক হাজারের বেশি জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করছে। এসব উৎপাদন থেকে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯৭ ভাগ যোগান দেয়ার পাশাপাশি বিদেশে ওষুধ রফতানি করছে। দেশের ওষুধের চাহিদার ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ মেটানোর পর বিদেশে ওষুধ রফতানি হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের ১৮৭ ধরনের ওষুধ বিদেশ যায়। বাংলাদেশ থেকে গত বছর সবচেয়ে বেশি ওষুধ রফতানি করেছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নোভার্টিস (বিডি)।

রফতানি তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি গত বছর ১১৬ কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন করে, যা দেশে মোট উৎপাদিত ওষুধের ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। বহুজাতিক এ কোম্পানির ওষুধের দুই-তৃতীয়াংশই রফতানি হচ্ছে। রফতানিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বেক্সিমকো ফার্মা, গত বছর ওষুধ রফতানি করে ৮০ কোটি ২৪ লাখ টাকার। রফতানিতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ৩৭টি দেশে তাদের ওষুধ রফতানি করছে। গত বছর তারা রফতানি করে ৬৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার ওষুধ। পঞ্চম স্থানে থাকা দি একমি ল্যাবরেটরিজ গত বছর বিভিন্ন দেশে তারা রফতানি করে ১৭ কোটি ২১ লাখ টাকার ওষুধ। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা এসকে এফ বাংলাদেশ গত বছর ওষুধ রফতানি করে ১৬ কোটি টাকার। সপ্তম অবস্থানে রেনাটা লিমিটেড রফতানি করে ১৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকার ওষুধ। এ ছাড়া অষ্টম অবস্থানে থাকা জেসন ফার্মাসিউটিক্যালস ওই সময় ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা, নবম স্থানে থাকা অ্যারিস্ট্রোফার্মা ১১ কোটি ১৩ লাখ এবং দশম স্থানে থাকা বায়ো-ফার্মা লিমিটেড ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকার ওষুধ বিভিন্ন দেশে রফতানি করে।

ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ১০টি দেশ ওষুধের আকর্ষণীয় বাজারে পরিণত হবে। এগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, ভারত, রাশিয়া ও কানাডা। এর মধ্যে চারটিতে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার রয়েছে। বাকি ছয়টিতেও বাংলাদেশ শীঘ্রই প্রবেশ করতে পারবে বলে ধারণা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ব্র্যাক ইএলপির একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ফার্মাসিউটিকাল খাতে গত সাত বছরের বাৎসরিক গড় উন্নয়নের হার ছিল ২৫.৫ শতাংশ। গত বছর দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ওষুধের বাজার ইউরোপে ওপথ্যালমিক পণ্য রফতানি করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিকালস।

ইউরোপীয় বাজারে এই রফতানি আগামীর জন্য এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, শীতাতপ ও কম্পন রোধক পণ্য রফতানিতে নতুন মাত্রা যোগ করে সর্বপ্রথম কোল্ড চেইন শিপমেন্ট বহনকারী ডিএইচএল গ্লোবাল ফরওয়ার্ডিং। নিরাপদে এবং সময় মতো ওষুধ রফতানির জন্য ২০০৫ সাল থেকে কোল্ড চেইন প্রক্রিয়ায় কার্গো সুবিধা দিচ্ছে ডিএইচএল।