সূর্যমুখীর বাণিজ্যিক চাষে সাফল্য সুখের হাসি

গ্রামের নাম ফুলগাছ। শুধু নামে নয়, গ্রামের চিত্রের সঙ্গে নামের সার্থকতা ফুটে উঠছে ক্রমেই। প্রথমবারের মতো লালমনিরহাটের ফুলগাছে বাণিজ্যিকভিত্তিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করে কৃষকরা সফল হয়েছেন। এই ফুল চাষের মাধ্যমে কৃষি অর্থনীতিতে ফুলগাছ গ্রামটি সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের কৃষক পরিবারগুলোর মুখে সূর্যমুখী ফুলের মতো হাসি। গ্রামটি তার ফুলগাছ নামকরণের সত্যিকার সার্থকতা ফিরে পাচ্ছে। এ অঞ্চলের কৃষকের খাতায় লাভজনক কৃষি ফসল হিসেবে সূর্যমুখী চাষ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। শহর থেকে মানুষ ছুটে আসছে গ্রামটির সৌন্দর্য দেখতে।

লালমনিরহাট জেলা সদরের অদূরে ফুলগাছ গ্রাম। জেলা শহর থেকে মাত্র ৪-৫ কিলোমিটার যেতে হবে। সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের ধরলা ও রত্নই নদীপাড়ের গ্রাম ফুলগাছ। কিভাবে গ্রামটির নাম ফুলগাছ হয়েছে কেউ বলতে পারে না। তবে ব্রিটিশ আমলে শাল ও সেগুন গাছের বাগান ছিল মোগলহাটে। সেই শাল ও সেগুনের ফুলের নামে নাম হয়েছিল ফুলগাছ। মোগলহাট রেলস্টেশনে সে দিনও কয়েক শ’ বছরের পুরনো একটি বিশাল সেগুন গাছ অবশিষ্ট ছিল। এখন অবশ্য নেই। গত দুই বছর আগে গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা গাছটি কেটে আত্মসাত করে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে বছরে দুই ফসলা জমিতে তিনটি অর্থকরী কৃষি ফসল আবাদের অংশ হিসেবে এই প্রথমবারের মতো লালমনিরহাট জেলায় ফুলগাছ গ্রামে সূর্যমুখী ফুলের বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়েছে।

এনজিও ব্র্যাকের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচীর আলোকে এ সূর্যমুখী ফুলের চাষ প্রকল্প হিসেবে প্রথমবারের মতো চাষ করা হয়েছে। ফুলগাছ ব্লকটিতে ৭৮ জন সুবিধাভুগী কৃষক ৩৪.১৯ একর জমিতে সূর্যমুখী ফুল চাষ করেছেন।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচীর ব্র্যাকের সদর উপজেলা ব্যবস্থাপক মোঃ নূর আলম জানান, প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে সূর্যমুখীর চাষ করা হচ্ছে। সূর্যমুখী ফুলের দানা থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদন করা হবে, যা কোলস্টেরেল মুক্ত। এ ছাড়াও সর্ষে বাটার মতো সূর্যমুখী ফুলের দানা খাওয়া যায়। গ্রামের মানুষের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনবে এ সূর্যমুখী ফুল চাষ।

ফুলগ্রামে গিয়ে কথা হয় সূর্যমুখী ফুলচাষী আজগর আলী ও নুর বক্সের সঙ্গে। নুর বক্সের এ ব্লকে ৮১ শতাংশ জমি রয়েছে। আজগর আলী ও নূর বক্স জানান, সূর্যমুখী ফুল চাষের আনন্দই আলাদা। মনের আনন্দে এই ফসল চাষ করা যায়। ফুল উঠার পর হাইব্রিড সাথী ধান এই জমিতে চাষ করা হবে। কৃষকরা জানান, এক বিঘা মাটিতে সূর্যমুখী চাষে খরচ হয় প্রায় ৩ হাজার টাকা। প্রতিবিঘায় ৮ মণ সূর্যমুখী ফুলের দানা উৎপাদন হবে। বাজারে এক মণ সূর্যমুখী ফুলের দানার দাম ১৫শ’ টাকা হলে বিঘাপ্রতি খরচসহ ১২ হাজার টাকায় উৎপাদিত ফসল বিক্রয় করা যাবে। খরচ বাদে বিঘাপ্রতি ৯ হাজার টাকা লাভ থাকে। সূর্যমুখী চাষের জমিতে বছরে তিনটি ফসল করা যায়। আমন, রবিশস্য ও বোরো ধান। সূর্যমুখী ফুলের গাছ জমির সবুজ সারের চাহিদা মেটায়। জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল মজিদ জানান, ফুলগাছ গ্রামে সূর্যমুখী চাষ করে গ্রামটির নামের সার্থকতা ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন গ্রামটির কৃষকরা। সত্যিকার অর্থে গ্রামটি এখন ফুলচাষের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। প্রথমবারের মতোই সূর্যমুখী ফুল চাষ করে কৃষক পরিবারগুলো ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে। প্রতিদিন ফুলের ক্ষেতের সৌন্দর্য দেখতেও মানুষ শহর থেকে গ্রামটিতে ছুটে আসছে। সূর্যমুখী চাষ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। কৃষক পরিবারগুলো ফুল চাষে লাভের মুখ দেখায় সূর্যমুখী ফুল চাষে ঝুঁকে পড়েছে। তিনি বলেন, শুধু কৃষক নয়, লালমনিরহাটে সেনাবাহিনী পরিচালিত কৃষি ও গবাদিপশুর ফার্মটিতেও পরীক্ষামূলকভাবে সেনাবাহিনী সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছে। তারা এই সূর্যমুখী ফুল চাষে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে।

জানা গেছে, সূর্যমুখী ফুল সারাদেশে ব্র্যাকের অধীনে ১২ জেলায় ৫৩টি ব্লকের মাধ্যমে চাষ হচ্ছে। লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় ৩২৪ একর জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করা হয়েছে। ৬৬৩ জন উপকারভোগী কৃষক রয়েছেন। ব্র্যাক এ সব কৃষককে বীজ ও নগদ অর্থ অনুদান দিয়েছে। লালমনিরহাট জেলা সদরের ৩৩.৪৫ একর, আদিতমারী উপজেলায় ২৮ একর, কালীগঞ্জ উপজেলায় ৫২ একর ও হাতিবান্ধা উপজেলায় ৫২ একর জমিতে সূর্যমুখী ফুলের বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ৩০ একর, উলিপুর উপজেলায় ৩২ একর, চিলমারী উপজেলায় ৩০ একর ও নাগেশ্বরী উপজেলায় ৬৬ একর জমিতে সূর্যমুখী ফুলের বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়েছে। সূর্যমুখী ফুল ৯০ দিনের ফসল। প্রথমবারের মতো এ জেলায় চাষ শুরু হওয়ায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে ও হাতেকলমে শেখাতে হয়েছে। তবে এই জেলার সূর্যমুখী চাষীরা ব্র্যাকের লোকজনকে সহযোগিতা করেছেন। একেকজন কৃষক এখন নিজেই একজন সূর্যমুখী চাষের প্রশিক্ষকে পরিণত হয়েছেন।