এমডিজির সবগুলো লক্ষ্য পূরণের পথে বাংলাদেশ

মনি মাহমুদ : সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির ৮টি মূল লক্ষ্য (গোল) নির্ধারিত হয় ২০০০ সালে। ২০১৫ সালের মধ্যে অতিদারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে ১৮৯টি দেশ এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে। লক্ষ্য অর্জন করতে দেশগুলোর মধ্যে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের ইতিবাচক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ মোট ৮টি বিষয়ে কে কতো আগে নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে তা নিয়েই ওই প্রতিযোগিতা। আর সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ প্রথমস্থানে রয়েছে। স্বল্পোন্নত ৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে।
৮টি লক্ষ্যমাত্রার প্রায় সব কটিতেই বাংলাদেশের অর্জন স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্ববাসীর। সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজির সবগুলো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চায়। অর্জনের যেসব সূচক রয়েছে তার প্রায় ১০টিতে এরই মধ্যে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ। বাকি ১০টিতেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণের একেবারে কাছাকাছি। এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সাফল্যের স্বীকৃতিসরূপ বাংলাদেশ এরই মধ্যে ৩টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও লাভ করেছে।
সরকার মনে করছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এমডিজির ৮টি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে বাংলাদেশ পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারবে। সেই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি বিভাগকে আরো সক্রিয়ভাবে কাজ করার নির্দেশনা রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। আগামী বছরের আগে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন সেক্টরে।
জানা গেছে, এমডিজির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন, জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যু হ্রাস, মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন, এইডসসহ ঘাতক রোগ নির্মূল, টেকসই পরিবেশ নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এগিয়ে। অষ্টম যে লক্ষ্যমাত্রাটি রয়েছে তা হলো ‘গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর ডেভেলপমেন্ট’। এ বিষয়টিতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কাজ করছে সরকারসহ বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো। বছর দেড়েকের মধ্যে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থায় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একসময় শিশুমৃত্যুর বিষয়টি ছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। পোলিও, ডিপথেরিয়া, হাম, হুপিংকাশির মতো ঘাতকব্যাধি অনেক শিশুর জীবন কেড়ে নিতো। কিন্তু এখন আমূল পরিবর্তন এসেছে। এসব রোগ আর কোনো সম্ভাবনাময় জীবনকে অকালে থামিয়ে দিতে পারে না। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালানোয় শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমেছে। একসময় গর্ভবতী মায়ের পরিচর্যা, নিরাপদ প্রসব, গর্ভবতী মায়ের টিকা ও পুষ্টি বিষয়ে সুব্যবস্থা না থাকায় প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য বিপজ্জনক পর্যায়ে ছিল। সেই চিত্রেও পরিবর্তন এসেছে। মাতৃস্বাস্থ্য ও মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমেছে। এছাড়া এইচআইভি এবং এইডস, ম্যালেরিয়াসহ যক্ষ্মার মতো ঘাতকরোগ নির্মূলেও বাংলাদেশের রয়েছে ব্যাপক সাফল্য।
পরিবেশের দিক দিয়েও বাংলাদেশের অর্জন অন্য অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতির শিকার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। সবার আগে একটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান প্রণয়নসহ প্রতিরোধমূলক অনেক ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ প্রশংসা অর্জন করেছে বিশ্ববাসীর। পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
জানা গেছে, দারিদ্র্য বিমোচনে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের মধ্যেই পূরণ হওয়ার বিষয়ে আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক ওই ঋণদাতা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৫ সাল নাগাদ তা কমিয়ে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে গত এক দশকের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক মনে করছে, নির্ধারিত
সময়ের দুবছর আগেই ২০১৩ সালের শেষ নাগাদ এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার কথা বাংলাদেশের। ‘বাংলাদেশ পোভার্টি অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ওই তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ধারাবাহিকভাবে কমে এসেছে। ২০০০ সালে যেখানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৩০ লাখ, ২০০৫ সালে তা কমে সাড়ে ৫ কোটিতে নেমে আসে। ২০১০ সালে তা আরো কমে ৪ কোটি ৭০ লাখে নেমে এসেছে। এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এ দুটো লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ সঠিক পথেই রয়েছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।
প্রসঙ্গত, এমডিজিতে দেয়া লক্ষ্যমাত্রাগুলোর অধিকাংশই অর্জিত হয়েছে, বাকিগুলো অর্জনের পথে রয়েছে। এই অর্জনের প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে ২০১০ সালে। শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে অনন্য সাফল্য অর্জন করায় ওই বছর জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এমডিজি অ্যাওয়ার্ড দেয়। ২০১১ সালে স্বাস্থ্য খাতে গুণগত মান উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করায় আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন, সাউথ সাউথ নিউজ ও জাতিসংঘের আফ্রিকা সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কমিশন যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রীকে সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এছাড়া সম্প্রসারিত টিকাদানে সুফল অর্জন করায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের প্রশংসা করে। জাতিসংঘ মহাসচিব ছাড়াও বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ উন্নত বিশ্ব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ব্যাপক প্রশংসা করে। উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির রোল মডেল।