অস্থির সময়েও শিল্পে সাফল্য

মনি মাহমুদ : ২০১৩ সালে শিল্প খাতে সরকারের সাফল্য কম নয়। তবে মেয়াদের শেষ বছরে অন্যান্য খাতের মতো শিল্প খাতেও কম-বেশি অস্থিরতা ছিল। পোশাকশিল্পে কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা সাফল্যকে অনেকটা ম্লান করে দেয়। সাভারে রানা প্লাজাধসে সহস্রাধিক শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা বিশ্বে আলোড়ন ফেলে। সঙ্গে তৈরি হয় আন্তর্জাতিক চাপও। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করলে খাতটি নতুন করে চাপের মুখে পড়ে। আবার বিরোধীদের আন্দোলনের বছর হওয়ায় শিল্প-উৎপাদন যথেষ্ট ব্যাহত হয়।
শিল্প খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, টুকটাক কিছু সমস্যা বাদ দিলে সম্প্রতি শিল্প খাতে বাংলাদেশ অনেক অর্জন করেছে। সরকারের শেষ বছরে অগ্রযাত্রা কিছুটা ব্যাহত হলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য দল-মত নির্বিশেষে সব ব্যবসায়ী গত বছর রাজপথে নামেন। তারা প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুই কা-ারির সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেন।
২০১২ সালের নভেম্বরে তাজরীন ফ্যাশনসে আগুনে শতাধিক প্রাণহানির মাস পাঁচেক পর ঘটে রানাপ্লাজা ট্র্যাজেডি। এতে পরে হুমকির মুখে পড়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী রপ্তানি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার (জিএসপি) সুবিধা। অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা রক্ষা করা যায়নি। ইউরোপে জিএসপি সুবিধা বাঁচানোর জন্য চলছে আন্দোলন, দেনদরবার।
জানা গেছে, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানি শতকরা প্রায় ২৩ ভাগ কমেছে। এতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্কবাবদ দিয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। এটা যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে ঋণ অনুদান নানাভাবে বাংলাদেশে আসে, তার প্রায় ৬ গুণ। এ থেকেই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পরিধিটা বোঝা যায়।
ব্যবসায়ীরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বাণিজ্যবিষয়ক অফিসের ওয়েবসাইটে তাদের জিএসপি-সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে ১২৭টি সুবিধাভোগী দেশথেকে আমদানি করা প্রায় ৫ হাজার পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার জন্যই এই জিএসপি। এর অন্য উদ্দেশ্য হচ্ছে আমদানি করা পণ্যে মার্কিন সামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করে মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। জিএসপির অধীনে যেসব পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, তার মধ্যে আছে নানা ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য, খনিজ দ্রব্য, জুয়েলারি, কার্পেটসহ কিছু কৃষি ও মৎস্যজাত দ্রব্য রয়েছে। যেসব পণ্য জিএসপি শুল্কমুক্ত সুবিধাবহির্ভূত সেগুলোর মধ্যে আছে বেশিরভাগ বস্ত্র ও পোশাকসামগ্রী, বেশিরভাগ জুতা, হাতব্যাগ ও ব্যাগ। তাই প্রচারণা বা বিশ্বাস যা-ই থাকুক, তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে বাংলাদেশী পোশাক গার্মেন্টস যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে কোনো বিশেষ সুবিধা পায় না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্প খাত নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ঠিকই সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
কেবল পোশাকশিল্প নয়, অন্য খাতেও রয়েছে ইতিবাচক অনেক তথ্য। তবে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ২০১৩ সালে শিল্পমালিকদের কিছুটা বেগ পেতে হয়। নভেম্বর মাসে দেশজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করার পরও প্রবৃদ্ধি হয় ৩২ শতাংশ। বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও।
আর এর সিংহভাগই এসেছে শিল্প খাত থেকে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমদিকে শিল্প খাতে ব্যাপক সাফল্য রয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়। ৯৫৪ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে ৯৭৪ কোটি ৭১ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য। এ সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ১৭ বেশি। একক মাস হিসেবে অক্টোবরে ২১১ কোটি ৯২ লাখ ডলারের রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় এটি ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। এ ধরনের অনেক ইতিবাচক তথ্য তুলে ধরার মতো বছর ছিল ২০১৩। রপ্তানি আয়ের প্রধান দুই খাতের মধ্যে ওভেন পোশাক খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কম হয়েছে। তবে নিটওয়্যার এবং ওভেন পোশাক খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হওয়ায় সার্বিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, দেশে গত এক বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এ সময়ে পোশাক শিল্প খাতে দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে, যা দেশে-বিদেশে আমাদের ইমেজ নষ্ট করেছে। তবু এখনো রপ্তানি আয় ভালো। কিন্তু আইএলও, অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স কারখানা পরিদর্শন শুরু করবে। হয়তো দুর্বল কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এতে ভবিষ্যতে রপ্তানির পরিমাণ কমে যেতে পারে।
শিল্প খাতে অগ্রগতির পাশাপাশি বারবারই ঘুরেফিরে দুর্ঘটনার কর্থাবার্তা এসেছে। সভা-সেমিনারসহ বিভিন্ন ফোরামে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্ধারিত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ না করে পোশাকশিল্প-কারখানার ভবন তৈরি করলে, গার্মেন্টস শিল্প স্থাপনের অনুমতি দেয়া হবে না। তাজরীন ফ্যাশন ও স্মার্ট গার্মেন্টসে অগ্নিকা-ের ঘটনা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইমেজ অনেকটা ক্ষুণœ করেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, বর্তমানে পোশাকশিল্প খাতে প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। ২০২০ সাল নাগাদ তা বেড়ে দ্বিগুণ হবে। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এ শিল্পের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে তারা শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, অগ্নিকা- প্রতিরোধ, শ্রমিক প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণসহ ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।