২ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি

যাযাদি রিপোর্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। এ-সংক্রান্ত ঋণ প্রস্তাব বিশ্বব্যাংকের বোর্ড সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে অবস্থিত সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে। অনুমোদনের পরই সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের বোর্ড সভার কার্য তালিকায় এ বিষয়টি রয়েছে। সভা পিছিয়ে না গেলে আশা করা যাচ্ছে এই ঋণ অনুমোদন দেয়া হবে।
বিশ্বব্যাংক সূত্র জানায়, মিউনিসিপ্যাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সার্ভিসেস নামের প্রকল্পের আওতায় এই ঋণের অর্থ ব্যয় করা হবে। এটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ২ হাজার ৪৭০ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে ১ হাজার ৯৫৩ কোটি ৬৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, বাকি ৫১৭ কোটি ২৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে।
এদিকে প্রকল্পটি গত ২৬ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগের দিন আসন্ন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করায় ওই দিনের সভা বাতিল করা হয়েছে। এতে আগামীতে অনুষ্ঠেয় প্রথম একনেকে এটি অনুমোদন করা হবে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক সম্পাদিত গ্রোথ স্টাডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি, এমন ৫টি মেজর গ্রোথ করিডোর ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর এবং ময়মনসিংহের মধ্যে অবস্থিত পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এবং দক্ষিণ অঞ্চলের ৩টি জেলা শহরকে প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্র জানায়, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ নগরায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। নগরের জনসংখ্যা ১৯৭৪ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ শতাংশ হয়েছে এবং ২০১৫ সালে তা বেড়ে ৩৩ শতাংশে বা মোট জনসংখ্যার ৩ ভাগের ১ ভাগ হবে। দ্রুত নগরায়নের মুখে দেশের শহর ও নগরসমূহে অবকাঠামো ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। জীর্ণ অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, যানজট এবং পরিবেশ দূষণ বাংলাদেশের নগরগুলোর স্বাভাবিক চিত্র, যা শহরের উন্নত জীবনযাপনে অন্যতম বাধা। এরপরও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নগরায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখন যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নগরায়ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন, দারিদ্র্য হ্রাস ও উন্নতমানের নাগরিক জীবন নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশের পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলো আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। যদিও আর্থ-সামাজিক এবং পরিবেশগত বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের শহর এলাকায় দেশের শতকরা ৩০ ভাগ লোক বাস করে। জিডিপিতে যাদের অবদান শতকরা ৬০ ভাগ। শহর এলাকায় শ্রমের উৎপাদনশীলতা গ্রাম এলাকার চেয়ে অনেক বেশি।
এ পরিপ্রেক্ষিতে এর আগে বিশ্বব্যাংক শহর এলাকার মৌলিক নাগরিক সুবিধা প্রদান এবং পৌর প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মিউনিসিপ্যাল সার্ভিসেস প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করেছিল, যা ২০১২ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হয়েছে। এই প্রকল্পে রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশন এবং ১৭টি পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় ৪টি বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের আওতায় ১৫০টি পৌরসভায় সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল। এ ছাড়া দেশব্যাপী সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এলজিইডিতে মিউনিসিপ্যাল সাপোর্ট ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল। এ সময় বিএমডিএফ নামে একটি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়, যা স্থানীয় পর্যায়ে পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনগুলোকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ঋণ দিয়ে সাহায্য করছে।
ওই প্রকল্পের সফলতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আবারো একটি প্রকল্প নেয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলে বিশ্বব্যাংক এতে সাড়া দেয়। পরে মিউনিসিপ্যাল গভর্ন্যান্স সার্ভিসেস প্রকল্পে অর্থায়নে সম্মত হয় তারা।
বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে অনুমোদনের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ৪টি নতুন সিটি করপোরেশন ২২টি গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া প্রকল্পের মাধ্যমে ১৪৬টি পৌরসভায় ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন সাপোর্ট প্রদান করা হবে এবং প্রকল্পের আওতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত তহবিল সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটি ৩টি কম্পোনেন্টে বাস্তবায়ন করা হবে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের কাজ শেষ করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
প্রকল্পটির অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত কাজ দেশের ৫টি বিভাগের ১৮টি জেলার ২৬ উপজেলা ও ২৬ পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে বাস্তবায়িত হবে। এগুলো হলো- নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, রংপুর সিটি করপোরেশন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, সিলেট সিটি করপোরেশন, টাঙ্গাইল পৌরসভা, এলেঙ্গা, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, ভালুকা, ত্রিশাল, মাধবদী, ভৈরব, শেরপুর সৈয়দপুর, গোবিন্দগঞ্জ, দাউদকান্দি, চান্দিনা, চৌদ্দগ্রাম, ফেনী, পটিয়া, মিরেরসরাই, সীতাকু-, চকরিয়া, শায়েস্তাগঞ্জ এবং মাধবপুর পৌরসভা।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে যেসব অবকাঠামো কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে, তা হচ্ছে ৬০০ কিলোমিটার আরবান সড়ক উন্নয়ন, ৫৭০ কিলোমিটার ব্রিজ/কালভার্ট নির্মাণ, ১২টি বাসটার্মিনাল, ৪টি ট্রাক টার্মিনাল, ৪টি বোট ল্যান্ডিং জেটি, ৪১০ কিলোমিটার ড্রেনেজ উন্নয়ন, ২৬টি কিচেন মার্কেট তৈরি, ২৬টি হোলসেল মার্কেট, ৩৬টি পাবলিক টয়লেট, ৬টি পার্ক উন্নয়ন এবং ৮টি কমিউনিটি সেন্টার তৈরি করা হবে।