টিআই প্রতিবেদন ২০১৩ : দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ তিন ধাপ এগোল

নিজস্ব প্রতিবেদক
এ বছর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় নিম্নক্রম অনুসারে ১৬তম অবস্থানে বাংলাদেশ; আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয়। গতবারের তুলনায় এবার নিম্নক্রম অনুসারে দুর্নীতির ধারণাসূচকে (সিপিআই) বাংলাদেশ এগিয়েছে তিন ধাপ এবং উচ্চক্রম অনুসারে এগিয়েছে আট ধাপ। ০-১০০ স্কেলে ২৭ স্কোর করে ১৭৭টি দেশের মধ্যে ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে ১৩৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, গত বছর ছিল ১৪৪তম। নিম্নক্রম অনুসারে বাংলাদেশ ১৬তম, গত বছর ছিল ১৩তম। এরপরও বাংলাদেশের এ অগ্রগতিকে ‘তাৎপর্যহীন’ মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) ‘বিশ্ব দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০১৩’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশকালে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বনানীতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সূচকের ০-১০০ স্কেলে ২৭ স্কোর পেয়ে ১৭৭টি দেশের মধ্যে ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে ১৩৬তম এবং নিম্নক্রম অনুসারে ১৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১১ ও ২০১২ সালের তুলনায় নিম্নক্রম অনুযায়ী তিন ধাপ এবং ২০১২ সালের তুলনায় ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী আট ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। তবে গত বছরের তুলনায় মাত্র এক স্কোর বেশি পেয়েছে বাংলাদেশ (২০১২ সালে ছিল ২৬)। ২০১১ সালেও বাংলাদেশের স্কোর ২৭ ছিল। ফলে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের দুর্নীতির ধারণা সূচকে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে।
ড. জামান বলেন, একমাত্র আফগানিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সাত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ নিম্নক্রম অনুযায়ী দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ যে মাত্র এক পয়েন্ট বেশি পেয়েছে তা বৈশ্বিক গড় ৪৩-এর চেয়ে অনেক কম। ফলে এ অগ্রগতি মামুলি এবং তাৎপর্যহীন।
স্কোর কত হলে দুর্নীতি কম বলে মনে করা হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে ড. জামান বলেন, ‘বৈশ্বিক গড় স্কোর যেহেতু ৪৩; তাই এ স্কোর বা তার বেশি হলে আমরা বলতে পারব, দেশে দুর্নীতির মাত্রা উদ্বেগজনক নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর এক পয়েন্ট এবং সিপিআই সূচকে তিন ধাপ অগ্রগতি হলেও এটি তাৎপর্যহীন। উচ্চমাত্রার দুর্নীতি কমেনি, ক্ষমতার অপব্যবহার এখনো আছে। ডেনমার্ক ও নিউজিল্যান্ড ২০১৩ সালে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত তালিকার শীর্ষে যৌথভাবে অবস্থান করছে; তাদের প্রত্যেকের স্কোর ৯১। আট স্কোর পেয়ে এবারের তালিকার সর্বনিম্নে সম্মিলিতভাবে অবস্থান করছে সোমালিয়া, উত্তর কোরিয়া ও আফগানিস্তান। ১১ ও ১৪ স্কোর পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে সুদান ও দক্ষিণ সুদান।
উল্লেখ্য, সূচকে ০ স্কোর পেলে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০ স্কোর পেলে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা সর্বোচ্চ সুশাসন প্রতিষ্ঠিত দেশ বলে ধরে নেওয়া হয়।
সুলতানা কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে বাগাড়ম্বর যতটুকু ছিল, দুর্নীতি দমনে কার্যকর, দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য কার্যক্রম তেমন দেখা যায়নি। বাংলাদেশে দুর্নীতি কমেছে- এ কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না; বরং অন্যান্য দেশ বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশ সূচকে এগিয়েছে।’
টিআইবি চেয়ারপারসন বলেন, ‘দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপক বিস্তার এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র জনগণ। আমরা সরকারের কাছ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাইনি। ফলে নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় সরকারকেই নিতে হবে।’
ড. জামান বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে সিপিআই সূচকে এ বছর প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদ্যোগ সত্ত্বেও কার্যকরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্তের অভাব রয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্প, রেলওয়েতে নিয়োগ-বাণিজ্য, শেয়ারবাজার, হলমার্ক ও ডেসটিনির দুর্নীতির ঘটনায় এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও জালিয়াতির মহোৎসবের শীর্ষে থাকা সোনালী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনাকে গুরুত্বহীন অভিহিত করায় দুর্নীতির অভিযোগে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পরিবর্তে দুর্নীতি অস্বীকার করার মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক আরো বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার অঙ্গীকারের বিপরীতে একগুচ্ছ সংশোধনী প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে সরকারের পুরো মেয়াদকালে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে রেখে প্রায় অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুদককে অনেক সময়ই সরকারের বি-টিমের মতো ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।’
ড. জামান বলেন, সংসদের শেষ অধিবেশনে সংবিধান ও সরকারের নিজস্ব নির্বাচনী অঙ্গীকার পরিপন্থী অবস্থান নিয়ে আইন সংশোধন করে দুদককে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাব অবশ্য এবারের সূচকে বিবেচিত হয়নি, কারণ সূচকের তথ্য সংগ্রহের পর ঘটনাটি ঘটেছে। তবে যেভাবে সংশোধনী নিয়ে সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে কালক্ষেপণ করে দুদককে স্থবির করে রাখার প্রবণতা দেখিয়েছে, তা নিশ্চয় পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টির আড়ালে ছিল না।