প্রাথমিকে ভর্তির রেকর্ড, ছুঁয়েছে ১০১ শতাংশের মাইলফলক – বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন

প্রাথমিক স্কুলে মোট ভর্তির হারে ১০১ শতাংশ অর্জনের মাইলফলক ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক টানাপোড়েন, হরতালে মানুষ পুড়িয়ে মারা, পোশাক শিল্পে অস্থিরতাসহ নানা খারাপ খবরের মাঝে এ সুখবর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে ৬২ শতাংশ, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে ৪৪ এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। সংস্থাটি তাদের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলেছে শিক্ষা খাতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শিক্ষার প্রায় সব ক্ষেত্রেই অভিগম্যতা ও সমতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এডুকেশন সেক্টর রিভিউ (২০১৩)-এর অভিগম্যতা ও সমতা বিষয়ক পলিসিনোটে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
আগামী ৩০ নবেম্বর এ প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয়ের যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহরিন এ মাহবুব। এতে কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেন্স জাট উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, আগামী দশ বছরে কর্মক্ষম নাগরিকের সংখ্যা বাড়বে এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কমবে। এ প্রেক্ষাপটে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় ও দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রবৃদ্ধিসহ সামনে এগোনোর এক দারুণ সুযোগ পাচ্ছে দেশটি। এই সযোগকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করে দেশটিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে উন্নীত করতে হলে ভাবতে হবে কি করে শিক্ষায় বিনিয়োগ অর্থবহভাবে বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে জোর প্রতিযোগিতায় নামা যায়।
মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অবিচলভাবে শিক্ষায় অভিগম্যতা বাড়িয়েছে, যার ফলে প্রাথমিক স্কুলে মোট ভর্তির হার ৯১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০১ শতাংশ হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তির হার ৫২ থেকে ৬২ শতাংশ হয়েছে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে ভর্তির হার ৩৩ থেকে ৪৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার ৭ থেকে ১০ শতাংশ হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে উপবৃত্তি। সংস্থাটির মতে, উপবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে অধিক সংখ্যায় নিম্নআয়ভুক পরিবারের শিশু ও মেয়েদের ভর্তির ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন অভিগম্যতা অর্জন করে ফেলেছে।
সংস্থাটির হিসাবে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ নারী-পুরুষ সমতাও অর্জন করেছে। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মেয়ে মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করতে পারে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এখন ছেলের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশি। মেয়েদের ক্ষেত্রে নিট ভর্তির হার ৪৪ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এ হার ৩২ থেকে ৪৫ শতাংশ হয়েছে। আগের চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী এখন স্কুলে টিকে থাকছে। গত ৩০ বছরে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা গড়ে যে কয়টি শ্রেণী অতিক্রম করতে পারে তার সংখ্যা বেড়েছে। এমনকি দরিদ্রদের ৫৭ শতাংশ ও সাধারণ পরিবারের শিশুদের ৮৩ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রতি ১০ জন প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মধ্যে মোটামুটি সাত থেকে আটজন পঞ্চম শ্রেণী যেতে পারে। এর মধ্যে মাত্র তিন থেকে চারজন কোন শ্রেণীতে পুনরাবৃত্তি না করে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর গ-ি পেরিয়ে যেতে পারে। ব্যয়ের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় বাজেটের ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা খাতে ব্যয় করে। যা পার্শ্ববর্তী উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাজেটে তুলনামূলকভাবে কম। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমপর্যায়ের দেশগুলো গড়ে জাতীয় বাজেটের ১৮ দশমিক ৭০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করছে। তবে বরাদ্দ দেয়া অর্থের ব্যবহারের অদক্ষতার কারণে পুনরাবৃত্তি ও ঝরেপড়ার উঁচু হার বজায় রয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিশ্বব্যাংক মনে করছে, স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। বিশেষ করে বস্তিবাসী শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। দারিদ্র্যের কারণে এখনও ৫০ লাখের বেশি শিশু স্কুলের বাইরে থেকে গেছে। এদের একটি বড় অংশ শহরের বস্তিতে অথবা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাস করে। যেসব শিশুর পরিবার সদ্য বস্তিতে উঠেছে তাদের মধ্যে ঝরেপড়ার ঝুঁকি আরও বেশি। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শিশুদের ভর্তির হার বাড়ছে তবুও এখনও ভর্তির মাত্র ২৩ শতাংশ। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে প্রারম্ভিক শিশু-বিকাশ কার্যক্রম সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিখনের অসমতা দূর করার একটি হলেও এ কার্যক্রম এখনও দেশজুড়ে প্রসার হয়নি। উচ্চ শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণও কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়েনি। দরিদ্র ও অদরিদ্রদের মধ্যে ভর্তির হারে ৩১ শতাংশ ফারাক রয়েছে।
বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সময় স্কুলে ধরে রাখার ওপর জোর দিতে হবে। তাই লাগসই প্রণোদনা সৃষ্টি করতে ও যোগাতে পারলে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপনে উদ্বুদ্ধ করবে। উচ্চ শিক্ষাকে সুলভ করে তোলার উপায় বের করতে পারলে তা আরও নাগালের মধ্যে এসে যাবে। আরও বেশি করে বৃত্তি, ছাত্র সহায়তা ও স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া সম্ভব হলে উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির হার বাড়বে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই তুমুল গতিতে দুস্তর পথ অতিক্রম করেছে এবং শিক্ষায় অভিগম্যতা ও সমতা অর্জনে অনেক দূর এগিয়েছে। দেশটি যদি শিক্ষার্থীদের আগে স্কুলে টেনে আনার এবং আরও বেশি সময় ধরে রাখার সৃজনশীল উপায় উদ্ভাবন করতে পারে এসব উদ্যোগ কালক্রমে অর্থনৈতিক সাফল্য সংহত করবে।

সূত্র – জনকন্ঠ