তবুও কৃষিতে সাফল্য

কৃষি লইয়া আমাদের আত্মশ্লাঘার অনেক কারণ রহিয়াছে। বিগত চার দশকে কৃষি জমি ক্রমান্বয়ে হরাস পাইয়াছে, তাহার পরও আমাদের খাদ্য উত্পাদন এক্ষণে বিশ্বে নজির সৃষ্টি করিয়াছে। এই অসম্ভব অর্জন সম্ভবপর হইয়াছে আমাদের শ্রমনিষ্ঠ কৃষক ও কৃষি বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে।
কিন্তু প্রদীপের নীচে যেইরূপে আঁধার ঘাপটি মারিয়া থাকে তেমনি কিছু অন্ধকারের দৃশ্য আমাদের কৃষি বিভাগে বিরল নহে। পত্রিকান্তরে জানা যায়, নওগাঁয় কৃষি বিভাগের ১৩৭ বাসভবন পরিত্যক্ত হইয়া রহিয়াছে বত্সরের পর বত্সর। সেই সকল সরকারি বাড়ি এখন ভূতের আখড়া। সেইখানে সত্যিকারের ভূত থাকুক বা না থাকুক ফেনসিডিল-গাঁজা খেকো মানুষ-ভূতের আনাগোনার অভাব নাই। শরীরী ভূত যেইখানে বিচরণ করে সেইখানে ইচ্ছেকৃতভাবে অযত্ন আর অবহেলা নিত্যসঙ্গী হইবে—ইহাতে বিস্ময়ের কী আছে? তাহার ফলে দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকিতে থাকিতে অধিকাংশ ভবনই বসবাসের অনুপযোগী হইয়া পড়িয়াছে। অথচ সেই ভবনগুলিতে বসবাস করিতে পারিতেন কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। কিন্তু ভবনগুলি নির্মাণের পর হইতেই সেইখানে বসবাসের অনীহা দেখান বেশির ভাগ কর্মকর্তা। নওগাঁ কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গিয়াছে, জেলার ১১টি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ১৮৯টি বিএস বাসভবনের মধ্যে মাত্র ৫২টি ভবনে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বসবাস করিতেছেন। অবশিষ্ট ১৩৭টি ভবন অব্যবহূত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। অথচ তাহাদের মাসিক বাড়ি ভাড়া মাত্র ৫০ টাকা। প্রায় ত্রিশ বত্সর যাবত্ অব্যবহূত এই ভবনগুলির অধিকাংশেই এখন বহিরাগত অথবা ছিন্নমূল মানুষ আবাস গাড়িয়াছে। তাহাতে উধাও হইয়া গিয়াছে জানালা-দরজা। যথেচ্ছাচারের সুযোগে অনেক বাসভবনে চলিতেছে মাদকের আড্ডা। এই চিত্র শুধু নওগাঁ জেলার হইলেও সারাদেশে এমন উদাহরণ আকছার মিলিবে। নওগাঁর উদাহরণ বলিয়া দেয়, যাহার যেইখানে থাকিবার কথা তিনি সেইখানে কার্যসম্পাদন করিতে অনেক সময়ই ইচ্ছুক থাকেন না। শুধু কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর নহে, সরকারের প্রায় সকল বিভাগেই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কর্তাকর্তা শ্রেণীর কর্মচারীরা কর্মসম্পাদন করিতে খুব বেশি উত্সাহ বোধ করেন না। তাই কোনোরূপ সুযোগ থাকিলেই তাহারা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইয়া নিজের পছন্দসই জায়গায় পোস্টিং নেন।
অথচ স্বাধীনতার পর গত ৪২ বত্সরে মানুষ দ্বিগুণ বাড়িলেও, আবাদি জমি ২০ হইতে ৩০ শতাংশ হরাস পাইলেও আমাদের খাদ্যশস্য উত্পাদন বৃদ্ধি পাইয়াছে তিন গুণ। প্রধান খাদ্যশস্যের উত্পাদন বৃদ্ধির গ্রাফে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠিয়া আসিয়াছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ তিন বত্সরে আমাদের প্রয়োজন পড়ে নাই একমুঠো চাল আমদানি করিতেও। অথচ ২০১০ সালের পূর্বেও প্রায় ফি বত্সর আমাদের ১০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করিতে হইত চাল আমদানি করিতে। বিস্ময়ের কথা হইল, জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি শতকের মধ্যে বাংলাদেশের ধান ও গমের উত্পাদন যথাক্রমে ২০ ও ৩০ শতাংশ কমিবার সম্ভাবনা ছিল। কী আশ্চর্য! সেই দু:স্বপ্নের বিপরীতে গত পাঁচ বত্সরে আমাদের ধান ও গমের উত্পাদন কিনা বৃদ্ধি পাইয়াছে গড়ে আড়াই হইতে তিন শতাংশ! ফলে, বিশ্বের ক্ষুধা সূচক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রহিয়াছে বাংলাদেশ। মাত্র এক বত্সরেই এই সূচকে আমরা ১১ ধাপ অগ্রসর হইয়াছি।
এই সকল কৃতিত্বের পুরোভাগে রহিয়াছেন আমাদের পরিশ্রমী কৃষক ও মেধাবী বিজ্ঞানীরা। আমাদের উন্নতির গ্রাফ নিশ্চয়ই আরও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হইতে পারিত, যদি কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের ছোটবড় সকল বিষয়েই আমরা আরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারিতাম। দেশের উন্নয়ন একটি সামষ্টিক বিষয়, তাহাতে অবদান রাখিবার মানসিকতার ভিতরে এক ধরনের আনন্দ রহিয়াছে। ক্ষুদ্রস্বার্থ বিসর্জন দিয়া সেই আনন্দকে হূদয়ে ধারণ করিতে হইবে সকল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের।

সুত্র