উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ

উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ ডা. মোহাম্মদ ফজলুল হক

বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে ১৮টি দেশ এগিয়ে আছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নির্মূলে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে রয়েছে। মানদণ্ডে বিচার-বিশ্লেষণ করলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিতেই হবে। আগামী নির্বাচনে কাকে ভোট দেবে, তা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে দেশের উন্নয়নের হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে। বহির্বিশ্বে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদিসহ সব সেক্টরের উন্নয়নকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। তাই আমাদের দেশেও নির্বাচনের ক্ষেত্রে উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সব সরকারকেই তার শাসনামলের পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডের হিসাব সঠিকভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে বিগত সময়ের চেয়ে দেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সামনের দিকে যাচ্ছে, না পেছনে, না একই স্থানে অবস্থান করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বিভিন্ন সেক্টরে উন্নয়নের ছাপ পড়েছে, তা অস্বীকার বা গোপন করার কোনো বিষয় নয়। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য মডেল দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের রোডম্যাপে বাংলাদেশের অবস্থানকে অত্যন্ত স্বর্ণোজ্জ্বল বলে অভিহিত করেন। বর্তমান ও পূর্ববর্তী সরকারের শাসনামলের তুলনামূলক আলোচনায় দেখা যায়, ২০০৬ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৩ সালে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৬ সালে রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৩ সালে ২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৬ সালে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৩ সালে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১০ টাকায় কৃষকদের ব্যাংক হিসাব খোলা ও সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদানের ব্যবস্থা। বর্তমান সরকার গত সাড়ে চার বছরে মালয়েশিয়ায় আড়াই লাখ শ্রমিক প্রেরণ ও ছয় লাখ বাংলাদেশিকে সৌদি আরবে চাকরি করার বৈধতা প্রদানের ব্যবস্থা করে। আগে বিদেশে যেতে তিন-চার লাখ টাকা ব্যয় হতো, দালালের খপ্পরে পড়ে চাকরি তো দূরের কথা, জেল খেটে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরত আসা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। সামাজিক নিরাপত্তা যেমন- দুই লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ জনকে বয়স্ক ভাতা প্রদান, ৯ লাখ দুই হাজারজনকে বিধবা ভাতা প্রদান, দুই লাখ ৮৬ হাজারজনকে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান। ২০১৩ সালে খাদ্য উৎপাদন ৩ দশমিক ৫০ কোটি টন অর্থাৎ ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি (২৩ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত)। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বিনিয়োগ ২৬০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ২০০৯ থেকে ২০১২ সময়ে ৮৫৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীতকরণ। গত চার বছরে গৃহহীনের আশ্রয়ের নিমিত্তে ১৬৪টি গুচ্ছগ্রামে ১৯ হাজার তিনটি পরিবারকে পুনর্বাসন, সাত হাজার ১৮৮টি গৃহহীন পরিবারের জন্য এক হাজার ৯৮টি ব্যারাক হাউস নির্মাণাধীন। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহে ৪ লেনবিশিষ্ট রাস্তা নির্মাণাধীন, কুড়িল ফ্লাইওভার, মিরপুর এয়ার পোর্ট ফ্লাইওভার, বনানী ফ্লাইওভার তৈরি ও হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার ডিসেম্বর ২০১৩ সালের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। মানুষের মাথাপিছু গড় আয় এক হাজার ৪৪ মার্কিন ডলার বা ৮৫ হাজার টাকা। ২০১১ সালে ৯৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ শিশুদের স্কুলে আনা এবং ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের হার ৪৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২১ শতাংশে নিয়ে আসা হয়েছে। অন্যদিকে ১ জানুয়ারি ২০১৩-তে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই সময়ে ২৭ কোটি নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়ে দেশবাসীকে অবাক করে দেওয়া হয়েছে বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ৩৫টি মাদ্রাসাকে আইসিটি ল্যাবসহ মডেল মাদ্রাসায় উন্নীতকরণ ও ১০০টি মাদ্রাসায় ভোকেশনাল কোর্স চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি উচ্চশিক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং এক লাখ ৪০ হাজার জন শিক্ষককে চাকরিতে সরকারীকরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় ৭৫ লাখ নারীকে মাসে ৩০ কেজি হারে খাদ্যশস্য প্রদান ও ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ, টিআর, কাবিখা ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে বছরে তিন হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা ব্যয় করছে বর্তমান সরকার। দৈনিক ২৩ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মিত হয়েছে ঢাকায়।
বর্তমান সরকারের আমলেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান সরকারের। এমনিভাবে শিক্ষা, গবেষণা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও কৃষিসহ বিভিন্ন সেক্টরে আগের তুলনায় যথেষ্ট অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা হ্রাস পেলে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতার আন্তরিকতা বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যতে এ দেশকে অনেক দেশই মডেল হিসেবে গ্রহণ করবে।
লেখক : অধ্যাপক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।
fhoque.hstu@gmail.com