খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর সাফল্য

আজ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭০ সালের পহেলা অক্টোবর ঢাকা থেকে ২২ মাইল উত্তরে জয়দেবপুর নামক স্থানে শালবনের পাশ ঘেঁষে জন্ম নেয় ইস্ট পাকিস্তান রাইস রিসার্স ইনস্টিটিউট। স্বাধীনতার পর ধান গবেষণার সূতিকাগার প্রতিষ্ঠানটি নাম বদলে হয় বাংলাদেশ রাইস রিসার্স ইনস্টিটিউট (ব্রি)। বাংলাদেশে ধান গবেষণার শুরু ১৯০৯ সালে। তখন সুপ্রসিদ্ধ ঢাকা ফার্ম ছিল সমগ্র উপমহাদেশের ধান গবেষণার প্রাণকেন্দ্র। ঢাকা ফার্মের বিজ্ঞানীরা দিবারাত্রি পরিশ্রম করে ৬০ দেশী-বিদেশী উন্নত মানের ধান এ অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন দেয়।
আদি ধানের জাতগুলোর উৎপত্তিস্থল গন্ডোওয়ানা মহাদেশ। এই মহাদেশটি ভেঙ্গে যে অংশটি বর্তমানে ভারত উপমহাদেশ সেখানেই ক্রমবিকাশ ঘটে ওরাইজা জেনেরা। পরবর্তীকালে ওরাইজা সেটিভা উপজাতটি এশিয়ায় এবং ওরাইজা গ্লারিরীমা উপজাতটি আফ্রিকা মহাদেশে জুড়ে জনপ্রিয় ও চাষাবাদ হতে থাকে। প্রত্ন তাত্ত্বিকরা চীনের জোমিয়াং প্রদেশের ইউউয়াও কাউন্টির হেমেডুগ্রামে ৭০০০ বছর পূর্বে ইন্ডিকা জাতের ধানের অস্তিত্ব খুঁজে পান। সেই সঙ্গে প্রমাণ পান হ্যাংগঝু উপসাগরের কূলবর্তী অঞ্চলেই ইন্ডিকা ধানের আবাদ প্রচলিত ছিল। থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার সীমান্তের ভূতের গুহা নামক স্থানে ধানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। গুহাগুলোতে ছয় হাজার বছর পূর্ব থেকে ধানের চাষাবাদ হতো।
চীনের নিংপো উপভাষায় ধানকে উলিজ বা উলিস বলা হতো। এই উলিজ শব্দকে আরবীয়রা ওরাজ নামকরণ করেন। যা পরবর্তীকালে গ্রীক ভাষায় ওরাইজা হয়ে যায়; যা ফরাসী ভাষায় রিজ এবং ইংরেজী ভাষায় বর্তমানের রাইস হয়ে যায়। রাইস বলতে ধান বুঝায়, তবে আমাদের দেশে রাইস মানে চাল এবং ধানের ইংরেজী নাম পেডি। চাল হলো মিলড রাইস বা কলে ছাঁটা ধান।
ধানের দেশ বাংলাদেশ। চাষী ভাইবোনদের হাত ধরেই আউশ, আমন, বোরো ও অন্যান্য জাতের ক্রমবিকাশ ঘটেলি। বোনা আমনের যেসব জাত বেশি বন্যা সহ্য করতে পারে না তা থেকেই কালক্রমে রোপা আমন বা ট্রান্সপ্লানটেট আমনের জাতসমূহের সৃষ্টি হয়। যেমন কালো আমন বাজাইল, লক্ষ্মীদীঘা ধান (৭-৮ হাত গভীর পানিতে হতে পারে) তা থেকে জোয়াল ভাঙ্গা, বাদল, কার্তিকা বা কাটিয়া বাগদার এবং পরবর্তীতে তিলক কাচারী ধানের উৎপত্তি হয়। এ তিলক কাচারী ধান, জলী আমন ও রোয়া আমন ধানের মাঝে আছে। এর বন্যা প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে; তবে কারা আমন, দুধলাকী বা ধলা আমনের সমকক্ষ নয়। এসব তিলক কাচারী জাতের ধান থেকে আশ্বিনা ও ভদোইয়া এবং পরবর্তীতে শাইল ধানের জাত, যেমন ইন্দ্রশাইল, দুধসর, ঝিঙ্গাশাইল, দাদখানি বা কাটারী ভোগ জাতের উদ্ভব হয়। এদের মধ্যে ঝিঙ্গাশাইল জাতের ধান লম্বা এবং কালিজীরা, চিনিগুঁড়া, বাদশাহ ভোগ, কাশকাখি ও রাঁধুনী পাগল জাতীয় ক্ষুদ্রাকৃতির পোলাও চাল। সুগন্ধী ও সবচেয়ে ছোট চাল বিশিষ্ট ধানের জাতটি হলো রাঁধুনী পাগল। ভাদুইয়া বা আশ্বিনা থেকে বাছাই করে সৃষ্টি করা হয় আউশ জাতের ধানসমূহ। এসব আউশ জাতের ধানসমূহের জীবনকাল ৯০-১১০ দিন এবং শাইল বা রোপা আমন জাতের আগুল জাতের ধানের জীবনকাল প্রায় ১২০-১২৫ দিন। তবে রায়েদা, জলী আমন ও শাইল ধানের জাতসমূহের জীবনকাল বিশেষ করে ফুল ফোটার সময় হয় দিনের দৈর্ঘ্য যখন ১২ ঘণ্টার নিচে নেমে যায়। সেজন্যে সব আমন ও শাইল ধানকে বলা হয় আলোক সংবেদনশীল। অন্যদিকে আউশের জাতসমূহ আলোকে সংবেদনহীন। রায়েদার যেসব জাত রবি মৌসুমে হতো তা থেকে কিছু কিছু জাত বৈশাখ মাসেই ফুল দিতে শুরু করার কালক্রমে তা থেকেই বোরো জাতের ধান সৃষ্টি করা হয়। বোরো শব্দ সিলেটের বাঁওড় শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করে। বোরো ধান আলোক সংবেদনহীন। এভাবেই তৈরি হয় আউশ, আমন ও বোরো ধানের জাতসমূহ। এ দেশের হাজার হাজার ধান চাষী তাদের নিজস্ব চাহিদা মাফিক হাজার হাজার ধানের জাত তৈরি করে ফেলে। ১৯৩০ এর দিকে জরিপে জানা যায়, সে সময় অবিভক্ত বাংলায় প্রায় পনেরো হাজার ধানের জাত ছিল।
আমাদের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা ধানকেন্দ্রিক। কিছুকাল আগেও গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ ছিল গ্রামবাংলার গর্বের বস্তু। ভেঁতো বাঙালী, দুধ-ভাতে বাঙালী, মাছ ভাতে বাঙালী, ডাল-ভাতে বাঙালী, কত ধানে কত চাল, পুরান চাল ভাতে বাড়ে, হাতে নয় ভাতে মরা এসব অসংখ্য প্রবাদ থেকে বুঝা যায় ভাত আমাদের কত প্রিয় আর আত্মার আত্মীয়। মৌসুমি ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে চলে নবান্নের উৎসব। বিবাহ উৎসবে ধান-দূর্বা দিয়ে বর কনেকে বরণ করে নেয়া হয়। নবজাতকের আগমন বার্তা পেয়ে ধান-দূর্বা দিয়ে পোয়াতি মাকে বরণ করার রীতি প্রচলিত আছে। গ্রামবাংলার বহু পরিবারে শিশু খাবার খাওয়ার উপযুক্ত হলে ভাত খাইয়ে অন্নপ্রাসন অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
ষাটের দশকের সবুজ বিপ্লবের ঢেউ এদেশে আছড়ে পড়ে ১৯৬৮ সালে। এ সালে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত আইআর-৮, আইআর-৯ নামক দুটি ধানের জাত এদেশে ইরি ধান নামক তুমুল জনপ্রিয় হয়।
বিগত চার দশকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট চারটি হাইব্রিডসহ ৬৫টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এদের ফলন সনাতন জাতের চেয়ে ২-৩ গুণ বেশি। ব্রি’র এসব উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততা সহনশীল ৭টি, আকস্মিক বন্যা মোকাবেলায় ২টি, খরা সহনশীল ৩টি, মঙ্গা মোকাবেলায় ২টি, সর্বাধিক ফলনের ৪টি এবং সুগন্ধী ও রফতানি উপযোগী ৩টি জাত। আধুনিক ধান চাষের জন্য মাটি, পানি ও সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ৫০টির বেশি উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। ৩৯টি লাভজনক ধানভিত্তিক শস্যক্রম উদ্ভাবন, ২২টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন, ধানের ৩১টি রোগ ও ২৬৬টি ক্ষতিকর পোকা শনাক্তকরণ, বালাই ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন, প্রায় আটষট্টি হাজার কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষককে বিভিন্ন মেয়াদী প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ২৪৬টি বই-পত্র প্রকাশ। দেশে আবাদকৃত উফশী ধানের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ জমিতে ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাত চাষ করা হয় এবং এ থেকে পাওয়া যায় দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ ভাগ। ১৯৭০-৭১ সালে এদেশে চালের উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৩৫ লাখ টনে। ধান গবেষণা ও সম্প্রসারণে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগ থেকে ৪৬ টাকা মুনাফা অর্জন হচ্ছে। ১৯টি দেশে ব্রি উদ্ভাবিত ২০টি জাতের ধান চাষ করা হচ্ছে। বিজ্ঞান ও কৃষি উন্নয়নে অবদানের জন্য ব্রি ও এর কয়েকজন বিজ্ঞানীর তিনবার স্বাধীনতা দিবস স্বর্ণপদক ও তিনবার রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক, পরিবেশ পদক ২০০৯ সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মোট ১৬টি পুরস্কার লাভ করেছে। সেই সঙ্গে বহির্বিশ্বেও ব্রি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে।
দেশীয় আট হাজার ধানের জার্মপ্লাজম বর্তমানে ব্রি জিন ব্যাংকে সংরক্ষিত আছে। সম্প্রতি ব্রি ধান-৬২ নামক জিংকসমৃদ্ধ জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ ধানের জাত (গোল্ডেন রাইস) উদ্ভাবনে ব্রি সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে। ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-২৯ নামক দুটি মেগা ভ্যারাইটি বোরো মৌসুমে ৮০ ভাগ জমিজুড়ে চাষ হয়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও ক্লাইমেট চেঞ্জ তথা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে কৃষিকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে অসম যুদ্ধে। তাই তো কৃষিবিজ্ঞানীরা খরা, বন্যা, হঠাৎ বন্যা, লবণাক্ততা-সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে গবেষণা করছে। আগামী দিনে প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যই নিশ্চিত করবে খাদ্য নিরাপত্তা। আজকের এই আনন্দঘন প্রতিষ্ঠালগ্নে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত।

মনিরুজ্জামান কবির
লেখক : বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর। mkabir1986@yahoo.com