দুই মাসেই গত অর্থবছরের বিক্রি ছাড়াল সঞ্চয়পত্র

বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই ছাড়িয়ে গেছে গত অর্থবছরের পুরো বিনিয়োগ। আমানতের নিম্নগামি সুদহার, পুঁজিবাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও ব্যাংকে নানা ধরনের জাল-জালিয়াতির ঘটনায় মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি (২০১৩-১৪) অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ হয়েছে এক হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। যেখানে গত (২০১২-১৩) অর্থবছরের পুরো সময়ে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৭২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিল ৬২৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। আগস্টে নিট বিনিয়োগ এসেছে ৬৯১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। দুই মাসের নিট বিনিয়োগ এক হাজার ৩১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮৪.৯০ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিল ৪৬২ কোটি ১৮ লাখ টাকা।

আমানতের সুদহার কমে আসায় অনেক গ্রাহক এখন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। সম্প্রতি সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন স্কিম সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে আসেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকের আমানতের সুদহার দিন দিন কমে যাচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার আমানতের সুদহার থেকে বেশি। এ ছাড়া শেয়ারবাজার পরিস্থিতিও এখনো তেমন সুবিধাজনক পর্যায়ে এসেছে বলে মনে হচ্ছে না। এসব কারণে তিনি এখন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের কথা ভাবছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের মন্দাভাব, হলমার্কসহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতির ঘটনা, আমানতে সুদের হার কমে আসায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত কালের কণ্ঠ বলেন, ব্যাংকগুলোয় এখন অনেক অলস টাকা পড়ে আছে। আমানতের খুব একটা চাহিদা নেই তাদের। ফলে আমানতের সুদহার কমে যাচ্ছে। এ কারণে অনেক গ্রাহকই এখন সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন।

জায়েদ বখতের মতে, শেয়ারবাজারের আউটলুক এখনো তেমন একটা ইতিবাচক হয়নি। তা ছাড়া ব্যাংকে নানা ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয়পত্রকে বেছে নিচ্ছেন অনেক গ্রাহক।

সঞ্চয় পরিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্ট মাসে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের অধিকাংশই ছিল পরিবার সঞ্চয়পত্র। এ ছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র বিক্রিও মোটামুটি। এ ছাড়া অন্য সঞ্চয়পত্রগুলোর তেমন একটি চাহিদা নেই।

জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তরের মাধ্যমে বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে। পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার (মেয়াদান্তে) ১৩.৪৫ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১৩.১৯ শতাংশ এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১২.৫৯ শতাংশ।

অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর স্থায়ী আমানতের বর্তমান সুদহার সর্বনিম্ন ১১ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১২.৫০ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের তিন থেকে ছয় মাসের স্থায়ী আমানতের মুনাফার হার ১১ শতাংশ। সোনালী, রূপালী ও জনতা ব্যাংক দিচ্ছে ১১.৫০ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি (দুই থেকে তিন বছরের) স্থায়ী আমানতের মুনাফার হার ১২.৫০ শতাংশ। সোনালী, রূপালী ও জনতা ব্যাংক দিচ্ছে ১২ থেকে ১২.২৫ শতাংশ পর্যন্ত। চলতি বছরের মার্চ ত্রৈমাসিক থেকে আমানতের সুদহার কমতে শুরু করে।

গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে আশানুরূপ বিনিয়োগ না আসায় চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে চার হাজার ৯৭১ কোটি টাকা করা হয়। গত অর্থবছরের সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সাত হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল সরকার। তবে বিক্রি কম হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে এক হাজার ৯৭৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র বিক্রি দাঁড়ায় ৭৭২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, যা ওই অর্থবছরের সঞ্চয়পত্র বিক্রির পূর্বঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১০.৪৪ শতাংশ।