উদ্ভাবনওড়ার অপেক্ষায় স্বপ্নচারী

উদ্ভাবনওড়ার অপেক্ষায় স্বপ্নচারী

পিরোজপুর পুলিশ লাইন সড়কের পাশে বৈদ্যপাড়ায় উৎসুক মানুষের ভিড়। ভিড়টা মূলত বিসমিল্লাহ মেশিনারি স্টোর নামের ওয়ার্কশপ ঘিরে। কৌতূহলী দৃষ্টিতে ওরা দেখছে ওয়ার্কশপের মালিক আল-আমিনের ‘জাদু’। বাস্তবিকই জাদু দেখিয়ে চলেছেন অর্ধশিক্ষিত তরুণ আল-আমিন। টমটম, ইজিবাইক, বাইসাইকেলকে দ্রুতগতির মোটরযানে পরিণত করার পর এখন তিনি স্বপ্ন দেখছেন নিজের তৈরি হেলিকপ্টার নিয়ে আকাশে ওড়ার।
কৃষ্ণবর্ণের তরুণ আল-আমিনকে দেখলে প্রথমেই মনে পড়বে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট খেলোয়াড় মালিঙ্গার কথা। চেহারা, চুলের স্টাইল, চলাফেরা- সবই ওই লঙ্কান ক্রিকেটারের মতো। লম্বা চুলে লাল রং করে সবার কাছে প্রিয় খেলোয়াড়ের নামে নিজেকে মালিঙ্গা বলেই পরিচয় দেন তিনি।
মা-বাবা ও চার ভাইবোনের সংসারে দারিদ্র্যের থাবা ছোটবেলা থেকেই। অর্থকষ্টে পরিবারের বড় ছেলে আল-আমিনের লেখাপড়ার পাট চুকে গেছে অষ্টম শ্রেণীতেই। ১৩ বছর বয়সেই তাঁকে ধরতে হয় সংসারের হাল। তবে স্বপ্ন ছিল। আর তা লালন করে গেছেন এই তরুণ। শৈশবে স্কুলের বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষকদের সামনে সগর্বে ঘোষণা দিয়েছিলেন- ‘একদিন বড় কিছু উদ্ভাবন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেব।’ হেঁটেছেনও সেই স্বপ্ন পূরণের পথে। মোটর মেকানিক হিসেবে বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ে কাজ করতে করতে আজ তিনি একজন উদ্ভাবক। এলাকাবাসীও স্বীকার করে, আল-আমিনের কারিগরি মেধা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা অবাক করার মতো!
আল-আমিনের মা নাসিমা বেগম বলেন, ‘অভাবের সংসার আর চলছিল না। এই অবস্থায় ছেলে রেন্ট এ কারের মোটরসাইকেল ভাড়ায় চালাতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই অল্প কিছু টাকা জমিয়ে সে একটি ওয়ার্কশপ দিয়ে বসে। সেখানে বিভিন্ন ভাঙা টমটম, অটোরিকশা ইত্যাদি ঠিকঠাক করার কাজ শুরু করে। ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু করার চিন্তা ছিল ওর মাথায়। হঠাৎ দেখলাম অবিকল টমটম ও ইজিবাইক নিজেই বানিয়ে ফেলল। সেগুলো ঠিকঠাক হওয়ায় ভাড়ায় খাটিয়ে ব্যবসা শুরু করল।’
নাসিমা বেগম বলেন, ‘ব্যবসা করে হাতে একটু টাকাপয়সা আসতেই ছেলেকে পেয়ে বসল মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও হেলিকপ্টার তৈরির নেশা। এরপর বাইসাইকেলে ইঞ্জিন বসিয়ে সেটাকে দ্রুতগতির মোটরযানে পরিণত করল। কিছুদিন যেতে না যেতেই ছোট আকারের একটি হেলিকপ্টার তৈরি করে আকাশে ওড়ালো। পুলিশের ভয়ে আবার তা ভেঙেও ফেলল। এরপর একজন পুলিশ সদস্য অভয় দেওয়ায় ছেলে মহা-উৎসাহে বড় আকারের হেলিকপ্টার তৈরিতে হাত দিল। এদিকে অর্থকষ্টে সংসার চলে না। ওয়ার্কশপের আয় ওই হেলিকপ্টারের পেছনে খরচ করে। রাতে ঘুমায় না। একটাই চিন্তা, কখন নিজের তৈরি হেলিকপ্টার নিয়ে আকাশে উড়বে।’
আল-আমিনের নির্মীয়মাণ হেলিকপ্টার দেখতে প্রতিদিন শত শত উৎসুক মানুষ ভিড় করছে। তিনি মাঝেমধ্যে হেলিকপ্টারটি চালু করে সবাইকে দেখান। এই খুদে উদ্ভাবক বলেন, ‘আমি বড় কিছু একটা করতে চাই। কিন্তু পড়াশোনা করতে পারি নাই। টেলিভিশনে জিওগ্রাফি চ্যানেলে একদিন রাতে হেলিকপ্টার তৈরি করা দেখেছিলাম। পরদিন সকালেই ছোট্ট একটা হেলিকপ্টার তৈরিতে হাত দেই। কয়েক দিনের মধ্যে সেটাকে আকাশে ওড়াতে সক্ষম হই। তখনই বড় আকারের হেলিকপ্টার বানানোর চিন্তা মাথায় আসে। ছোটবেলায় পুলিশ লাইন স্কুলে পড়ার সুবাদে কয়েকজন পুলিশ স্যারকে চিনতাম। তাঁদের কাছে গিয়ে আমার ইচ্ছার কথা বলে হেলিকপ্টার বানানোর অনুমতি চাই। অনুমতি পাওয়ার পর আমি এ কাজে হাত দেই। এ পর্যন্ত আমি দেড় থেকে দুই লাখ টাকা এর পেছনে খরচ করেছি। এটাকে আকাশে ওড়াতে হলে আরো টাকার প্রয়োজন। অর্থাভাবে কাজটা এগোচ্ছে না। কারো সাহায্য পেলে ভালো হতো।’
আল-আমিনের সাবেক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নরোত্তম দেবনাথ বলেন, "স্কুলে পড়া অবস্থায় ও প্রায়ই বলত, ‘আমি একদিন বড় কিছু আবিষ্কার করবই।’ অভাবের তাড়নায় ছেলেটা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। এখন নিজের চেষ্টায় একের পর এক যানবাহন তৈরি করে চলেছে। নিজের তৈরি হেলিকপ্টারে আকাশে ওড়ার সাধ নিয়েই ওর অগ্রযাত্রা। আশা করি ও সফল হবে।"
আল-আমিনকে উৎসাহদাতা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ওর কারিগরি মেধা অবাক করার মতো। সে জন্য উৎসাহ জোগাই- ছেলেটি একদিন যেন স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে।’
আল-আমিনের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতে কালের কণ্ঠের মাধ্যমে দেশবাসী ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এলাকার বাসিন্দা নিজাম শেখসহ আরো অনেকে।