উন্নত প্রযুক্তি- বাড়বে ফলন, কমবে উৎপাদন ব্যয় শেকৃবিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার

বশিরুল ইসলাম ॥ দেশে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, সে হারে কমছে আবাদী জমি। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে খাদ্য চাহিদাও। চাহিদা মোকাবেলা করতে কৃষি বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন জাত আবিষ্কারের পাশাপাশি নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন। দেশে জমি তৈরি, আগাছা দমন এবং ধান মাড়াই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে করতে পারলেও চারা লাগানো এবং কাটার মতো কাজগুলো কৃষক এখনও সনাতন পদ্ধতিতেই করছে। তাই ধান উৎপাদন খরচের সিংহভাগ ব্যয় হয় চারা লাগানোর কাজেই। কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার কাজকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হলো উন্নত প্রযুক্তির রাইস ট্রান্সপ্লান্টার। এ যন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের ফলন ১৫ ভাগ বেড়ে যাবে এবং উৎপাদনখরচও ৫০ শতাংশ কমে যাবে বলে মনে করছে কৃষি বিজ্ঞানীরা। হেকেপ সাব প্রজেক্ট ‘সিপি-৫২৯’ এর উপপ্রকল্পটির ব্যবস্থাপক প্রফেসর ড. পরিমল কান্তি বিশ্বাসের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই প্রযুক্তি ব্যবহার চলছে। তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে উন্নত প্রযুক্তির এই রাইস ট্রান্সপ্লান্টারটি সম্প্রতি চালু করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিতত্ত্ব মাঠে। জাপান ও কোরিয়াতে সত্তর ও আশির দশকে শুরু হলেও বাংলাদেশে এটি এখনও নতুন প্রযুক্তি।
রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের ব্যবহার সম্পর্কে শেকৃবি উপাচার্য প্রফেসর মোঃ শাদাত উল্লা বলেন, কৃষি শিক্ষার পদ্ধতি ও গবেষণার কার্যক্রমকে গতিশীল করতে চালু করা হয়েছে এ যন্ত্রটি। এ যন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের ফলন ১৫ ভাগ বেড়ে যাবে। উৎপাদনখরচও ৫০ শতাংশ কমে যাবে। তিনি আরও বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে বিঘাপ্রতি জমিতে চারা লাগাতে খরচ হয় ১৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকা। রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে একই জমিতে খরচ পড়বে ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকা। কারণ একজন অভিজ্ঞ কৃষক একাই এ প্রযুক্তির মাধ্যমে অল্প সময়ে অধিক জায়গা চারা রোপণ করতে পারবে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চারা রোপণ একটি শ্রমিকসাশ্রয়ী প্রযুক্তি। এ যন্ত্রের মাধ্যমে বোরো ও আমন উভয় মৌসুমে জমিতে চারা রোপণ করা যায়।
প্রফেসর ড. পরিমল কান্তি বিশ্বাস দৈনিক জনকন্ঠকে জানান, সনাতন পদ্ধতিতে ধানের চারা রোপণ করতে গেলে শিকড় ছিঁড়ে যায়। ফলে ধানের উৎপাদন কম হয়, সময়ও বেশি লাগে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে মাটিসহ চারা প্লাস্টিক ট্রেতে করে জমিতে রোপণ করা যায়। এই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষক সনাতন পদ্ধতির চেয়ে স্বল্প সময় ও কম খরচে অধিক ফসল উৎপাদন করতে পারবে। আঙ্গুলের ন্যায় দেখতে সাধারণ এই প্রযুক্তির রোপণকারী অংশটির মাধ্যমে উৎপাদিত ধানের প্রতিকেজিতে ২ টাকা করে বাঁচবে সনাতন পদ্ধতির চেয়ে। চারা রোপণ সম্পর্কে তিনি জানান, জমিতে এক সেন্টিমিটার পানি আছে এমন অবস্থার চারা রোপণ করা ভাল। মেশিনে চারা রোপণ করার সময় সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ৩০ সেন্টিমিটার। চারা থেকে চারার দূরত্ব হবে ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার। চারা উচ্চতা হবে ১২-১৫ সেন্টিমিটার এবং ৩-৪ পাতা গজিয়েছে এমন চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। চারার বয়স আমন মৌসুমে ১২ থেকে ১৫ এবং বোরো মৌসুমে ২৫-৩০ দিন। চারা উৎপাদনের জন্য প্লাস্টিক ট্রে অথবা পলিথিনের ওপর বসানো কাঠের ফ্রেম ব্যবহার করা হয়। আধুনিক এই প্রযুক্তিটিকে সহজলভ্য করে এর প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দিলে একদিকে কৃষক যেমন লাভবান হবে, অন্যদিকে দেশও কৃষিক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।