টেলিকম খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিলাম আজ

আজ বহু প্রতীক্ষিত তৃতীয় প্রজন্ম বা থ্রিজি মোবাইল সেবার লাইসেন্সের নিলাম অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশের টেলিকম খাতের ইতিহাসে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটিই সর্বোচ্চ নিলাম। ধারণা করা হচ্ছে, এই নিলামের মাধ্যমে সরকারের কোষাগারে কমপক্ষে ছয় হাজার কোটি টাকা জমা হতে পারে। এতে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্ম বা টুজি মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল অংশ নেবে এবং এ চার অপারেটরই লাইসেন্স পাবে। বাদ পড়ছে শুধু দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর সিটিসেল।
সিটিসেল আবেদন করলেও এ বিষয়ে নির্ধারিত আর্নেস্ট মানি বা বায়নার টাকা জমা দেয়নি। আর এ লাইসেন্সের নীতিমালা অনুসারে নিলামে অংশ না নিয়েও রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক লাইসেন্স পাচ্ছে। এ অপারেটরটি গত ১৪ অক্টোবর তাদের পরীক্ষামূলক থ্রিজি সেবা চালু করেছে। বর্তমানে প্রায় দুই লাখ গ্রাহক এ সেবা নিচ্ছে বলে টেলিটক কর্মকর্তাদের দাবি। অন্য অপারেটররা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ১৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা করে প্রায় ৬২২ কোটি টাকা আর্নেস্ট মানি জমা দিয়ে নিলামে অংশ গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছে।
থ্রিজি লাইসেন্সের নীতিমালা অনুসারে বেসরকারি পাঁচ মোবাইল অপারেটরের মধ্যে তিনটি এবং নতুন একটি অপারেটরকে এ লাইসেন্স দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন কোনো অপারেটর আবেদন না করায় বেসরকারি পাঁচ অপারেটরের মধ্যে চারটি লাইসেন্স পাচ্ছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস এ বিষয়ে জানান, কোরিয়ার একটি অপারেটর শেষ মুহূর্তে যোগাযোগ করে আবেদনের সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সময় বাড়ানো আর সম্ভব হয়নি। নতুন অপারেটর অংশ না নেওয়াতে নিলামে প্রতিযোগিতা তেমন জমবে না বলেই ধারণা। তবে তা মানতে নারাজ সুনীল কান্তি বোস। তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিযোগিতা কম হবে- এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। নিলামে দর উঠবেই।’
বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও ধারণা, স্পেকট্রামের অবস্থানগত সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে প্রতিযোগিতা হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা অপারেটর তাদের পছন্দমতো অবস্থানের স্পেকট্রাম পাবে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান জানান, তাঁদের হাতে ২১০০ ব্র্যান্ডের মোট ৪০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম রয়েছে। এর আগে টেলিটককে তাঁরা এ ব্র্যান্ডের ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দিয়েছেন। সব মিলিয়ে ৫০ মোগাহার্টজ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে থ্রিজি সেবার জন্য।
নিলাম অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সাহারা খাতুন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বিটিআরসি ও এনবিআর চেয়ারম্যানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা হাজির থাকবেন।
জানা যায়, থ্রিজি লাইসেন্সের জন্য আর্নেস্ট মানি ছাড়াও সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের পারফরম্যান্স ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবেও ১৫০ কোটি টাকা করে জমা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া আজকের নিলামে নির্ধারিত দরে প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম নিতে হবে। নিলামে প্রতি মেগাহার্টজ স্পেকট্রার্মের ভিত্তিমূল্য ধরা হয়েছে ২০ মিলিয়ন বা দুই কোটি আমেরিকান ডলার। প্রতি অপারেটরকে কমপক্ষে পাঁচ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম কিনতে হবে। এ লাইসেন্সের জন্য আবেদনপত্রের ফি ছিল পাঁচ লাখ টাকা। লাইসেন্স গ্রহণের জন্য ১০ কোটি টাকা করে দিতে হবে। আর বার্ষিক লাইসেন্স ফি দিতে হবে পাঁচ কোটি টাকা। নিলামে বিজয়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট স্পেকট্রাম ফির ৬০ শতাংশ ৩০ কার্যদিবস ও ৪০ শতাংশ পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে হবে। ১৫ বছরের জন্য দেওয়া হবে এ লাইসেন্স। পরবর্তী সময়ে প্রতি পাঁচ বছরের জন্য নবায়নের সুযোগ থাকবে। থ্রিজি সেবায় প্রাপ্ত আয়ের ৫.৫ শতাংশ রাজস্ব বিটিআরসিকে দিতে হবে। সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ডে জমা দিতে হবে অপারেটরের নিরীক্ষিত মোট আয়ের ১ শতাংশ।
নীতিমালা অনুসারে প্রথম পর্যায়ে লাইসেন্স প্রাপ্তির ৯ মাসের মধ্যে অপারেটরদের সাতটি বিভাগীয় শহরে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮ মাসের মধ্যে দেশের ৩০ শতাংশ জেলায় এ সেবা চালু করতে হবে। নতুন অপারেটরের জন্য এ সময়সীমা ২৪ মাস। আর তৃতীয় পর্যায়ে দেশের সব জেলায় ৩৬ মাস বা তিন বছরের মধ্যে এ সেবা চালু করতে হবে।
আজকের নিলামে থ্রিজি লাইসেন্স ছাড়াও ফোরজি (চতুর্থ প্রজন্ম) এবং এলটিই (লংটার্ম ইভাল্যুশন) সেবারও আগাম অনুমতি পাবে অপারেটররা। তবে ওই সব সেবার জন্য প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম পেতে আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে তাদের।
এদিকে সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের প্রত্যাশা ছিল সিম প্রতিস্থাপনসহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিলামের আগেই সমাধান করবে সরকার। কিন্তু তা হয়নি। এর পরও গ্রাহকের স্বার্থ ও প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে চলার জন্য তারা নিলামে অংশ নিচ্ছে। তবে তারা হতাশ নয়। তারা আশা করছে, দ্রুততম সময়েই সরকার অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সমাধান করবে।
সুনীল কান্তি বোস এ বিষয়ে বলেন, অপারেটরদের দাবি অনুসারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যস্থতায় ভ্যাটের পরিমাণ ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পরও সিম পুনঃস্থাপনসহ বেশ কিছু অনিষ্পন্ন ইস্যুর সমাধান চেয়েছে অপারেটররা।