মিডডে মিল কর্মসূচী: চলো স্কুলে যাই, দুপুরে গরম খিচুড়ি খাই- ব্যাপক সাড়া

এ রহমান মুকুল ॥ পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া মিডডে-মিল (দুপুরের খাবার) কর্মসূচী পঞ্চগড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রাইমারি স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য স্থানীয় উদ্যোগে দুবছর আগে মিডডে-মিল চালু করা হয়। জেলার পাঁচ উপজেলায় ২০টি প্রাইমারি স্কুলে এ কর্মসূচী চালু থাকায় শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও বেড়েছে। শিক্ষকদের দাবি, এসব স্কুলে উপস্থিতির হার এখন শতভাগ। শিক্ষার্থীরাও বলছে, আগে না খেয়ে স্কুলে আসার পর দুপুরে টিফিনেই বাড়ি চলে যেতাম আবার অধিকাংশ দিন স্কুল কামাই দিতে হতো। এখন আর দুপুরে না খেয়ে থাকতে হয় না। তাই স্কুলও কামাই দেই না। ‘চলো স্কুলে যাই দুপুরে গরম খিচুড়ি খাই’ এই সেøাগানকে সামনে রেখে শিশুরা প্রতিদিন দল বেঁধে স্কুলে আসছে। এমনই কয়েকটি ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জনকারী প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা জানালেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারে তিন বেলা খাবারের সামর্থ্য না থাকায় অনেক শিশুই আগে না খেয়ে স্কুলে আসত। আবার অনেকে স্কুল কামাই দিত। মিডডে-মিল চালুর কারণে কোন শিশুই অভুক্ত থাকছে না। সকল শিশুই এখন নিয়মিত স্কুলে আসছে। ঝরেপড়ার রোধ হয়েছে। আগে অর্ধেকের বেশি শিশু স্কুলে ঠিক মতো আসত না, আবার এলেও দুপুরের পর থাকত না। অভিভাবকদের মুষ্টির চাল এবং বিভিন্ন সমাজ সেবীদের সহযোগিতায় স্থানীয় উদ্যোগে (কমিউনিটি পার্টিসেপেশন) চালু করা মিডডে-মিল শিশুদের পড়াশোনায় আগ্রহী করে তুলছে বলে প্রধান শিক্ষক দাবি করেন। যে সব স্কুল মিডডে-মিলের আওতায় এসেছে ওইসব স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক, এসএমসির সদস্যগণ সকলেই একবাক্যে বলেছেন, কয়েক বছর আগে পঞ্চগড় জেলায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রম ছিল। ওই কার্যক্রমে তেমন সাড়া না মিললেও মিডডে-মিল কর্মসূচী চালুর পর ব্যাপক সাড়া পড়েছে। তারা বলছেন, শুধু পঞ্চগড়েই নয় এ কর্মসূচী যেন সারাদেশে চালু করা হয়।
দেশের মধ্যে পঞ্চগড়ে প্রথম চালু হওয়া এই কর্মসূচী দুবছরে নীরবেই রীতিমতো পাল্টে দিয়েছে জেলার প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র। পঞ্চগড়ের সাবেক জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার (বর্তমানে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ জেলার ২টি প্রাইমারি স্কুলে পরীক্ষামূলক মিডডে-মিল কর্মসূচী চালু করে। বর্তমানে ২০টি স্কুলে এ কর্মসূচী চলছে। এতে ৬ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী উপকৃত হচ্ছে পুষ্টিমান সমৃদ্ধ গরম খাবার খেয়ে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মিডডে-মিল চালুর পর থেকে স্কুল এলাকায় শিশুদের মাঝে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। যেসব স্কুলে মিডডে-মিল চালু রয়েছে সেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান উন্নত হয়েছে। জাইকার ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত বছর ব্যতিক্রমী এ কর্মসূচী সরেজমিন পরিদর্শনে এসে টিম প্রধান মিয়াকো মাগামী তার পরিদর্শন বইয়ে লিখেছেন, স্থানীয় উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের স্কুলগামী করা যায় এবং ঝরেপড়া রোধ করা যায় সেটি তার জানা ছিল না। জাপানেও এই পদ্ধতি চালুর বিষয়ে তিনি চেষ্টা করবেন বলেও উল্লেখ করেন। স্কুল ফিডিং প্রকল্পের পরিচালক বাবুল কুমার সাহাও সরেজমিন দেখে গিয়েছেন স্থানীয় উদ্যোগে পরিচালিত মিডডে-মিল কর্মসূচী। শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রশ্ন করেছিলেন, সরকারী বরাদ্দ ছাড়া স্থানীয়ভাবে এ কর্মসূচী চালানো কী করে সম্ভব। কিন্তু পঞ্চগড় সেটাকে সম্ভবে পরিণত করেছেন।
পঞ্চগড়ের প্রাথমিক শিক্ষার চেহারা পাল্টে দেয়া এ কর্মসূচীর গোড়াপত্তন ও সফলতা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানা গেছে, প্রায় দুবছর আগে স্কুলে ঝরেপড়া রোধ, শতভাগ উপস্থিতি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয় উদ্যোগে, অভিভাবকদের মুষ্টির চাল এবং বিভিন্ন ব্যক্তিদের দান-অনুদান নিয়ে একটি তহবিলের মাধ্যমে জেলার বোঁদা উপজেলার নগরকুমারী সরকারী প্রাইমারি স্কুলে পরীক্ষামূলকভাবে মিডডে-মিল অর্থাৎ দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ছয় মাসের মধ্যে স্কুলটির সামগ্রিক চিত্র পাল্টে যায়। এই অভিজ্ঞতার আলোকে পর্যায়ক্রমে আরও ১৯টি স্কুলে মিডডে-মিল চালু করা হয়। যে সকল স্কুলে এ কর্মসূচী চালু রয়েছে সেসব স্কুলে শিক্ষার হার, উপস্থিতির হার, প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপনীর হার, মিডডে-মিল চালু না থাকা স্কুলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।
বোঁদা নগরকুমারী সরকারী প্রাইমারি স্কুলে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, দুপুর সোয়া ১টায় স্কুলের বিরতি হলে শিক্ষার্থীরা হাতে থালা আর পানির বোতল নিয়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। দুপুরে খাওয়ার নিয়মকানুন আগেই শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেয়া হয়। সপ্তাহে ৫ দিনের মধ্যে প্রথম ৩ দিন খিচুড়ি ও পরের ২ দিন ভাত, সবজি-ডাল বা ডিম খাওয়ানো হচ্ছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ২৫০ গ্রাম থেকে ৩০০ গ্রাম খিচুড়ি সরবরাহ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ছুটি হওয়ায় ওইদিন মিডডে-মিল বন্ধ থাকে।
৩০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন ২৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি তেল আর ১৫ কেজি আলুসহ সবজি দিয়ে খিচুড়ি রান্না করা হচ্ছে। শিশুদের মায়েরা স্বেচ্ছায় এই খাবার পালা করে রান্না করছেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটি পুরো বিষয়টি দেখভাল করছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিসার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে কর্মসূচী মনিটরিং করছেন।
রান্না করতে আসা এমন একজন মা ময়না যার মেয়ে রুনা ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ছে। তিনি বলেন, মেয়ে স্কুলে পড়ার সময় থেকে শিশুদের সেবা করার জন্য স্বেচ্ছায় রান্না করে দিচ্ছি। আমার রান্না করা খাবার একসঙ্গে অনেক শিশু খাচ্ছে এটা আমার খুব ভাল লাগছে। তিনি উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, এমন ভাগ্য ক’জনের হয়। আরও একজন মা বিলকিছ বলেন, আমার মেয়ে ইয়াছমিন ৩য় শ্রেণীতে পড়ে। নিজের সংসারের কাজ শেষ করে আমি স্কুলে রান্না করতে আসি। আমার হাতের রান্না শিশুরা মজা করে খাচ্ছে এতেই আমার আনন্দ।
শিশু শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাব্বী হোসেন, ৪র্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সৌরভ, ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুলতানা পারভীন দুপুরের খাবার পেয়ে খুব খুশি। তারা জানায়, অনেক সময় বাড়ি থেকে না খেয়ে স্কুলে আসতে হয়। আগে যখন স্কুলে খাবার ব্যবস্থা ছিল না তখন টিফিনের পর বাড়ি চলে যেতাম। মিডডে-মিল চালুর পর আর বাড়ি যাই না। নিয়মিত স্কুল আসি আর দুপুরে খিচুড়ি মজা করে খাই। তাদের কথা শেষ না হতেই খিচুড়ির জন্য থালা হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সকল শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বলে উঠে প্রতিদিন স্কুলে আসব বই পড়ব আর গরম খিচুড়ি খাব।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জুলফিকার হারুন জানান, পৃথিবীর কোন দেশেই দুপুরে পুষ্টিসমৃদ্ধ গরম খিচুড়ি খাওয়ার নজির নেই। শিশুরা প্রথম/দ্বিতীয় শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রায় ৫ ঘণ্টা ও তৃতীয় হতে পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রায় ১০ ঘণ্টা না খেয়ে স্কুলে অবস্থান করে। ফলে প্রতিবছর শুধু ক্ষুধা আর অপুষ্টির তাড়নায় অসংখ্য শিশু স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। এই ঝরেপড়া শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতেই সরকারী সাহায্যের বাইরে সম্পূর্ণ স্থানীয় উদ্যোগে জেলার ২০টি স্কুলে মিডডে-মিল কর্মসূচী চালু রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা জানান, ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদের দেয়া মুষ্টির চাল, ডাল দিয়ে বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার (মিডডে-মিল) পরীক্ষামূলক এ প্রোগ্রামটি চালু করা হয়েছে। এ কর্মসূচীতে অভিভাবকসহ সকলের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। অনেক শিশু না খেয়ে বিদ্যালয়ে আসে আবার অনেকে খেয়ে আসলেও দীর্ঘ সময় থাকার কারণে পড়াশোনায় মন বসাতে পারে না। আবার অনেকে বিরতির সময় খাওয়ার জন্য বাড়িতে চলে গিয়ে আর স্কুলে ফিরে আসে না। তাই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসার সময় শাক-সবজি নিয়ে আসে। টাটকা শাক-সবজি দিয়ে রান্না করা গরম খিচুড়ি শিক্ষার্থীদের খাওয়ানো হয়। সাবেক জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ বিনামূল্যে সরবরাহ করেছেন মর্মে তিনি জানান।
পরিচালনা কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম জানান, বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী মায়ের মুষ্টির চাল হতে প্রতিমাসে দুই কেজি করে চাল এবং ২৫০ গ্রাম মশুর ডাল প্রদান করছে। আর যারা দিতে পারছে না তাদের শিশুদের খাওয়ানো হচ্ছে। দুবছরে অভিভাবকসহ স্থানীয় অনেকেরই ব্যাপক সাড়া মিলছে বলে তিনি বলেন।