চার বছরে অর্থনীতির ১২ খাতে ব্যাপক অগ্রগতি

চার বছরে অর্থনীতির ১২ খাতে ব্যাপক অগ্রগতি

সাফল্য ধরে রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ পরিকল্পনা কমিশনের

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ গত চার বছরে অর্থনীতির ১২ ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এ সাফল্য ধরে রাখতে রাজনৈতিক স্থি’তিশীলতাসহ সাত বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি আগামী রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকনির্দেশকসমূহের আলোকে দেশের অর্থনীতির বর্তমান চিত্রের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে অর্থব্যবস্থায় যেসব পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনামূলক চিত্র পাওয়ার জন্য ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর হিসেবে ধরা হয়েছে। উপখাতভিত্তিক প্রবণতা বিশ্লেষণের পরিবর্তে দেশের অর্থনীতিকে সামগ্রিকভাবে বৃহৎ মানদন্ডে বিচার করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনের মূল আলোকপাত হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ফলাফলভিত্তিক অর্থনৈতিক অবস্থা।
বর্তমান সরকারের সময়ে গত চার বছরে যেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে সেগুলো হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, সরকারী রাজস্ব, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন, রফতানি ও আমদানি, চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, প্রবাসী আয়, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ, বৈদেশিক সাহায্য এবং মুদ্রা খাতের অগ্রগতি।
প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের মূল্যস্ফীতি ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে বাড়তে শুরু করে ২০১০-১১ অর্থবছরে এসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর পর থেকে এটি পতনশীল প্রবণতায় চলে আসে এবং বর্তমান বছর পর্যন্ত পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে পতনের ধারা বজায় রয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে অনিয়মিত ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে মূল্যায়ন হচ্ছে সাধারণভাবে মূল্য পরিস্থিতি গত এক বছর ধরে স্থিতিশীল রয়েছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেখা যায়, গত চার বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি। এ সময়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধির কারণে ৬ মিলিয়নেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে প্রায় ২ মিলিয়ন মানুষ কাজের উদ্দেশে বিদেশ গমন করেছে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে গত চার বছরে প্রায় ৮ দশমিক ২৭ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রাক্কলন অনুযায়ী পরিকল্পনার মেয়াদ শেষে (২০১৫ সালের মধ্যে) প্রায় ১০ দশমিক ৪ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বলা হয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বেকারত্বের হার কিছুটা বেড়েছে (পূর্বের তুলনায় ধীর গতিতে)। নারীদের ক্ষেত্রে এ চিত্র বিপরীত। কেননা ২০০৫-৬ সালের লেবার ফোর্স সার্ভেতে নারীদের বেকারত্বের হার ছিল ৭ শতাংশ, ২০১০ সালে এসে একই সার্ভেতে তা ৫ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। মোট বেকারত্বের হার ২০০৬ সালের তুলনায় সামান্যই বেড়েছে।
রাজস্ব খাতে দেখা যায়, গত চার বছরে কর ও করবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের চিত্র ছিল সন্তোষজনক। গত অর্থবছরে করবহির্ভূত রাজস্বের বেশ ভাল প্রবৃদ্ধির ফলে কর প্রবৃদ্ধির সামান্য হ্রাস ঢাকা পড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে গত তিন অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের সামগ্রিক চিত্র বেশ ভাল প্রবৃদ্ধির ধারণা প্রদান করে। এ কারণে রাজস্ব জিডিপির অনুপাত দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ (কর জিডিপির অনুপাত ১১ দশমিক ৩ শতাংশ)। ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি উচ্চহারে বাড়তে থাকে সেই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অনুযায়ীই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি এগিয়ে চলছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নে রেকর্ড (৯৬ শতাংশ) তৈরি হয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরেই জিডিপিতে এডিপির অবদান ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। গত অর্থবছরে জিডিপিতে এডিপির আকার ছিল ৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সংশোধিত এডিপিতে তা আরও বৃদ্ধি পায়। গত অর্থবছরেই (২০১২-১৩) জিডিপির শতকরা অংশ হিসেবে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল স্মরণকালের সর্বোচ্চ।
রফতানি ও আমদানির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, রফতানিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয় ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে। এ বছরই জিডিপিতে রফতানির অনুপাত ২০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছায়। বিগত বছরগুলোতে যা ১৬ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যেই ছিল। অন্যদিকে রফতানি আয়ের মতো প্রায় একই চিত্র আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি দিনদিন আরও বেশি উন্মুক্ত হচ্ছে। বাণিজ্য জিডিপির ক্রমবর্ধমান অনুপাত এ ঘটনারই নির্দেশক। অর্থনীতির এ উন্মুক্ততা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের গতিময়তারই ইঙ্গিত বহন করে।
চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত অংশে বলা হয়েছে, গত চার বছরে চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত ধনাত্মক অঙ্কে ছিল। বাণিজ্য ভারসাম্য ও চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত একই দিকে এগুচ্ছে। যেহেতু বাণিজ্য ঘাটতি কম, সেহেতু চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের আশাতীত বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বেড়ে যাওয়ায় চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত বেড়েই চলেছে। এদেশের জন্য এ প্রবণতা অভূতপূর্ব।
বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, গত চার বছরে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ সবসময়ই ১০ বিলিয়ন ডলারের উপরে ছিল। অথচ ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল মাত্র সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরের জুন মাসে এসে মজুদে রেকর্ড (১৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন) সৃষ্টি হয়। এ ধারা অব্যাহত আছে। যেখানে একটি দেশের তিন মাসের আমদানি সমতুল্য মজুদ যথেষ্ট মনে হয় সেখানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ এখন ৫ মাসের রয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কম পরিমাণ আমদানি, উচ্চ রফতানি এবং বছর বছর প্রবাসী আয় বৃদ্ধির কারণে ডলারের বিপরীতে টাকা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। গত অর্থবছরে টাকার ক্রমহ্রাসমান বিনিময় হার দেশের সুস্থ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীল পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, গত চার বছরে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে একটি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং গত অর্থবছরে তা রেকর্ড (১৫ বিলিয়ন ডলার) সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছর প্রবাসী আয় তিনগুণ বেড়েছে।
প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, গত চার বছর প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির ধারা স্থিতিশীল ছিল। ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। গত অর্থবছরে তা ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। যদিও প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়ছে কিন্তু তা ভিয়েতনাম বা মিয়ানমারের তুলনায় আকর্ষণীয় নয়।
বৈদেশিক সাহায্যের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ২০১১-১২ অর্থবছরের তুলনায় ২০১২-১৩ অর্থবছরে অনুদান প্রতিশ্রুতি হ্রাস পেলেও ঋণ প্রতিশ্রুতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অনুদান ও ঋণ বিতরণের পরিমাণ আগের যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি। ঋণ এবং অনুদান সহায়তায় প্রতিশ্রুতি এবং অর্থছাড়ে মিশ্র প্রবণতা বজায় ছিল।
মুদ্রা খাতের অগ্রগতির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, মুডি এবং এস এ্যান্ড পি উভয়ের ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ গত চার বছর ধরেই স্থিতিশীল সার্বভৌম রেটিং বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। রাজস্ব নীতিতে ব্যাপক সংস্কার ও খোলামেলা মুদ্রানীতির কারণে প্রাপ্ত স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ অর্জনের মূল নিয়ামক।