রেমিটেন্স বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

প্রবাসীদের সম্মেলন

দেশের অর্থনীতিকে শক্তভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রফতানি আয়, রেমিটেন্স, বিনিয়োগ, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে দেশটির সামনে। কিন্তু সম্ভাবনার এ সুযোগ গ্রহণ করতে হলে সব ধরনের সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন।

শনিবার রাজধানীর প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের সুরমা হলে অনুষ্ঠিত প্রবাসীদের এক সম্মেলনে বক্তারা এ সব কথা বলেন। সেন্টার ফর এনআরবির চেয়ারপার্সন এম এস সেকিল চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজেনা। প্রধান অতিথি হিসেবে ওই অনষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংক গবর্নর ড. আতিউর রহমান।

এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, ডিসিসিআই সভাপতি মোঃ সবুর খান এবং প্রবাসীরাও সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে ড্যান ডব্লিউ মজেনা আবারও বললেন, বাংলাদেশ এশিয়ান টাইগার হওয়ার পথে। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ হবে পরবর্তী এশিয়ান টাইগার। তবে সম্ভাবনার এ সুযোগ কাজে লাগাতে সমস্যা সমাধানের মানসিকতা থাকতে হবে।

বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে যেসব সমস্যা রয়েছে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের জন্য সামনে প্রচুর সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে। দেশের অবস্থান যেমন ভৌগোলিক দিক থেকে উৎকৃষ্ট, তেমনি রয়েছে এর প্রাকৃতিক সম্পদ। এখন শুধু প্রয়োজন এ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। তবে দেশে কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে। আর এ সমস্যা ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে সমাধানের পথে যেতে হবে। দেশের বিশাল জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তরের জন্য সবার জন্য সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে দেশটি ২০২১ সালের আগেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবে প্রবাসীরা। আমি বিশ্বাস করি, প্রবাসী বাংলাদেশীরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। দেশটির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশকে জানতে হবে তার কী সম্পদ রয়েছে।

তিনি বলেন, সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য এ সব খাতে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করতে হবে বাংলাদেশীদের। একই সঙ্গে এ সব খাতে প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের কাজে লাগাতে হবে। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে চীনের স্থান দখল করবে। তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ অদ্বিতীয় হয়ে উঠছে। এ ছাড়া চামড়াজাতপণ্য, ওষুধ, সিরামিকস ও কৃষি খাতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, রানা প্লাজা ধসের পরও পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ ভাল করছে। তবে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে চ্যালেঞ্জও বাংলাদেশকে গ্রহণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ধনী দেশে পরিণত হচ্ছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। এ সব নতুন উদ্যোক্তারা সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন।

ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক গবর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করা গেলে আরও ২ শতাংশ বেশি হারে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যেত। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এখন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভাবে অনেক এগিয়ে গেছে। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৬শ’ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। আমরা যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করি তার চেয়ে কম ব্যয় করি। আর এ কারণে রিজার্ভ বাড়ছে। এ রিজার্ভ বাংলাদেশের ভবিষ্যত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া রিজার্ভ বাড়ায় দেশে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বরাবরই প্রবাসীরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে। তাদের পাঠানো রেমিটেন্সে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। এ ছাড়া রিজার্ভ বাড়ার পেছনে রেমিটেন্স বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, প্রবাসীদের আয় অর্থনৈতিক কর্মকা-ের মূল ধারায় নিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে তাঁদের টাকা বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রবাসীরা এ দেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে এফবিসিসিআই তাঁদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

ওই অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি মোঃ সবুর খান বলেন, প্রবাসীদের বিনিয়োগ বাড়াতে ইতোমধ্যে ডিসিসিআই প্রধান কার্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হেল্পডেস্ক স্থাপন করেছে। ওই হেল্পডেস্কে এসে যে কোন প্রবাসী এমনকি বিদেশীরাও দেশের কোন্্ কোন্্ খাতে বিনিয়োগ হতে পারে এবং সুযোগ রয়েছে তা জানতে পারছেন। এ ছাড়া প্রবাসীদের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ঢাকা চেম্বার বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকবৃন্দ। এ ছাড়া বিএনপি নেত্রী শামা ওবায়েদসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা সম্মেলনে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশী এবং প্রবাসীদের সেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এয়ারলাইন্স ও বিদেশী মিশন প্রতিনিধিদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।