বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দৈর্ঘ্য স্ট্রিপ ম্যাপ তৈরির কাজ শুরু

মোহাম্মদ মোজাহারুল ইসলাম

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মোট চারটি রাজ্যের সীমানা আছে। সাবেক এ তিনটি রাজ্যের মধ্যে আসাম রাজ্য পরবর্তী সময়ে বিভক্ত করে (ক) আসাম (খ) মেঘালয় এবং (গ) মিজোরাম এই তিনটি রাজ্য গঠন করে ভারত। সেই কারণে সীমানা নির্ধারণের কাজ পাঁচটি সেক্টরে ভাগ করে পরিচালনা করা হয়। এ পাঁচটি সেক্টরে সীমানা রেখার দৈর্ঘ্য নিম্নরূপ_(ক) পশ্চিম বাংলা-২২৬২ কিমি (১৪০৫ মাইল)(খ) ত্রিপুরা-৮৭৪ কিমি (৫৪৩ মাইল)(গ) আসাম-২৬৪ কিমি (১৬৪ মাইল)(ঘ) মেঘালয়-৪৪১ কিমি (২৭৪ মাইল)(ঙ) মিজোরাম-৩২০ কিমিউলি্লখিত পাঁচটি সেক্টরের মধ্যে একমাত্র মিজোরাম সীমান্তের সীমানা নির্ধারণের কাজ সার্ভে অফ বাংলাদেশকে দেয়া হয়। বাংলাদেশ-ভারত (মিজোরাম ছাড়া) সীমানা রেখার মোট দৈর্ঘ্য ৩৮৪১ কিমি= ২৩৮৬ মাইল। এই ২৩৮৬ মাইল দৈর্ঘ্য সীমান্তের মধ্যে ১১৩ মাইল পরিবর্তনশীল সীমানা (ভষঁপঃঁধঃরহম নড়ঁহফধৎু)। অর্থাৎ নদীর মধ্য স্রোত বরাবর সীমানা রেখা গণ্য হবে। কিন্তু নদীর গতি পরিবর্তনের ফলে মধ্য স্রোত রেখার পরিবর্তন হবে। ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক সীমানা রেখার পরিবর্তন হবে। এই ১১৩ মাইল পরিবর্তনশীল সীমানার মধ্যে কুশিয়ারা নদীর মধ্য স্রোত বরাবর ২০ মাইল সীমানা এবং ইছামতি-সোনাই, কালিমন্দি, রাহমঙ্গল, হাতিয়াভাঙ্গা নদীর মধ্য স্রোত বরাবর ৯৩ মাইল সীমান্ত রেখা পরিবর্তনশীল সীমানা বলে গণ্য করা হয়। সম্ভবত এসব নদীর তীব্র স্রোতের কারণে এই ১১৩ মাইল সীমানা পরিবর্তনশীল সীমানা গণ্য করার জন্য উভয় দেশের মধ্যে পত্রালাপের মাধ্যমে স্থির করা হয়। কিন্তু উলি্লখিত নদীগুলো ইদানীং তাদের স্রোতের তীব্রতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে নদীর বুকে বড় বড় চর জেগে উঠেছে আর এ চরের দখল নিয়ে দুই দেশের সীমানা রক্ষা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাতক্ষীরা জেলায় বাঁশঅড়িয়ারচর এর অন্যতম উদাহরণ।স্ট্রিপ ম্যাপসীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ হয়ে গেলে, এই কাজে নিযুক্ত সার্ভেয়ার একটি ম্যাপ সিটে দুটি মেইন পিলার অর্থাৎ এক মাইল এলাকা এবং অন্যান্য পিলারের অবস্থান অঙ্কন করে স্ট্রিপ ম্যাপ প্রস্তুতের জন্য ম্যাপ সিট উবঃধরষ ঝঁৎাবুড়ৎ-এর কাছে হস্তান্তর করে দিবে। এই ম্যাপ সিটে দুটি মেইন পিলার। সবগুলো সাবপিলার এবং অন্যান্য পিলার অঙ্কন করে সিট উবঃধরষ ঝঁৎাবুড়ৎ-এর কাছে হস্তান্তর করবে। উবঃধরষ ঝঁৎাবুড়ৎ এক মেইন পিলার থেকে অন্য মেইন পিলার পর্যন্ত এক মাইল দৈর্ঘ্য এবং ‘ড়’ লাইন থেকে ভারতীয় ভূখ-ের ভেতরের এক মাইল এবং বাংলাদেশি ভূখ-ের অভ্যন্তরে ১ মাইল এই দুই মাইল প্রস্থের মোট ভূখ-ের বিস্তারিত উবঃধরষ অঙ্কন করে ম্যাপ তৈরি করবে। এটাকে স্ট্রিপ ম্যাপ বলা হয়। উবঃধরষ ঝঁৎাবুড়ৎ স্ট্রিপ ম্যাপ প্রস্তুতের জন্য চষধহব ঞধনষব ব্যবহার করে থাকে। পক্ষান্তরে মূল সীমানা নির্ধারণের জন্য ঞযবড়ফড়ষরঃব ব্যবহার করা হয়। এই এক মাইল ‘ড়’ লাইনের দৈর্ঘ্য এবং বাংলাদেশ-ভারতের উভয় পাশ্র্বে এক মাইল করে মোট দুই মাইল প্রস্থ এই বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্য অবস্থিত জমির আইল, পুকুর, নদী, মসজিদ, মন্দির, বড় গাছ, ঘরবাড়ি কিংবা অন্য কোন স্থাপনা ইত্যাদি যাবতীয় উল্লেখযোগ্য ঙনলবপঃ অঙ্কন করা হয়ে থাকে। এই স্ট্রিপ ম্যাপে যাবতীয় উবঃধরষ অঙ্কন করা হয়ে থাকে বলে যে কোন পিলার বিলুপ্ত হয়ে গেলে তার স্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। পরবর্তী সময়ে এই স্ট্রিপ ম্যাপ ছাপানো হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মোট স্ট্রিপ ম্যাপের অর্ধেক বাংলাদেশের ঢাকায় ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরে এবং অর্ধেক কলকাতা সার্ভে অফ ইন্ডিয়া অফিসে এবং ভারতে সংশ্লিষ্ট সেক্টরের আসাম কিংবা মেঘালয়ে ভূমি রেকর্ড অফিসে ছাপানো হয়। তবে তার আগে প্রত্যেকটি সিটে প্রথমে সার্ভেয়ার, তারপর চার্জ অফিসার, পরিচালক (জরিপ) মহাপরিচালক স্বাক্ষর করবেন। তারপর সিট ছাপানো হবে। এই ছাপানো ম্যাপের মধ্য থেকে ১০ কপি ম্যাপে উভয় সরকার কর্তৃক নিযুক্ত দেশের চষবহরঢ়ড়ঃবহঃরধৎু স্বাক্ষর করবেন। সীমানা নির্ধারণের পর প্রস্তুতকৃত স্ট্রিপ ম্যাপ চষবহরঢ়ড়ঃবহঃরধৎু স্বাক্ষরের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ ছিল। সম্প্রতি কিছু সিট স্বাক্ষর করা হয়েছে। স্ট্রিপ তৈরির অভিজ্ঞতাস্ট্রিপ ম্যাপ তৈরির কিছু অভিজ্ঞতা নিবন্ধকারের রয়েছে। ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাসে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের সীমানা নির্ধারণের কাজে যোগদানের পর কিছুদিন জরিপ কাজের প্রশিক্ষণ নিতে হলো। ১৯৭৪ সালে দিলি্ল চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গেছে। এরপর মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হওয়ার পালা। সে বছর ত্রিপুরা সেক্টরে দুটি ক্যাম্প স্থাপন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। একটা সীমানা নির্ধারণ ক্যাম্প অপরটি স্ট্রিপ ম্যাপ তৈরির জন্য ক্যাম্প। এ নিবন্ধকারকে দায়িত্ব দেয়া হলো স্ট্রিপ ম্যাপ তৈরির জন্য ক্যাম্পের। চার্জ অফিসার হিসেবে। কাজের এলাকা খোয়াই/বাল্লা বর্ডার থেকে পেশিয়াহাড়া চা বাগান এলাকার সীমান্ত পর্যন্ত। যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করা হলো। একটি অস্থায়ী অফিস স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে দেয়া হলো। এবার যাত্রার অপেক্ষা।ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত মহাপরিচালক পর্যায়ে সভায় বিস্তারিত কর্মসূচি তৈরি হয়েছিল। সেই কর্মসূচি অনুযায়ী কোথায় কখন বাংলাদেশি চার্জ অফিসার ভারতীয় কাউন্টার গার্ডের সঙ্গে দেখা করবে তা সুস্পষ্ট করে বলা আছে। কাজ শুরুর প্রথম দিন সকাল ১০টায় ভারতীয় কাউন্টার গার্ডের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু শাহজীবাজার পৌঁছতে ১০টার বেশি বেজে গেল। তাড়াহুড়ো করে রওনা হতে হলো বাল্লার উদ্দেশে। বাল্লায় পৌঁছতে বেলা প্রায় তিনটা বেজে গেল। ধারণা হলো অপেক্ষা করতে করতে কাউন্টার গার্ড ভদ্রলোক হয়তো বিরক্ত হয়ে চলে গেছেন। সহকারী চার্জ অফিসার আগেই বাল্লা পৌঁছে গেছেন। তিনিও ১০টা থেকে অপেক্ষা করছেন। তিনি স্বাভাবিকভাবে ভারতীয় অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে বিব্রত বোধ করছিলেন। এ অবস্থায় আমার গাড়ির শব্দ শুনে দৌড়ে এলেন। এসে জানালেন, ভারতীয় ক্যাম্পে অফিসার এখনও খোয়াই শহরে আছেন। খবর দিলে চলে আসবেন। খবর দিতে হলে খোয়াই নদী পার হতে হবে। নদী পার হওয়ার জন্য কোন নৌকা কিংবা ডিঙি নেই। জনসাধারণের পারাপারের প্রয়োজন হয় না। কারণ ওপার তো ইন্ডিয়া। ওপার যেতে হলে পাসপোর্ট ভিসার প্রয়োজন হয়। তাই নদী পারাপারের ব্যবস্থা নেই। হঠাৎ দেখা গেল ওপারে খোয়াই ঘাটে একটা নৌকায় একজন অফিসার উঠছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে নৌকা মাঝ নদীতে এসে গেল। বোঝা গেল নৌকায় আমার কাউন্টার গার্ড আসছেন। মাঝ নদী পার হতেই আমি হাত তুলে সম্ভাষণ জানালাম। ভদ্রলোক দুই হাত তুলে জবাব দিলেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে নৌকা এসে বাল্লা ঘাটে ভিড়ল। আমরা তাকে নামিয়ে আনলাম। বাল্লায় একটা রেস্ট হাউজ আছে। আমার সহকারী চার্জ অফিসার সেখানেই আস্তানা গেড়েছেন। আমাদের বসার ব্যবস্থা করা হলো।মিটিং শেষ হতে প্রায় ১ ঘণ্টা লাগল। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে সার্ভেয়ারকে যে সিটের কাজ করতে দেয়া হবে এবং সেই অনুযায়ী সিট বিতরণ করাসহ যাবতীয় কাজ সহকারী চার্জ অফিসারকে বুঝিয়ে দেয়া হলো। – See more at: http://www.sangbad.com.bd/index.php?ref=MjBfMDhfMTdfMTNfMl8yM18xXzEzOTY0Mg==#sthash.5u6MLR8T.dpuf