জরায়ুমুখ ক্যান্সার চিকিৎসায় সাফল্য প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর

প্রতি বছর ৪ লাখ ৭০ হাজার নারী এ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। যার মধ্যে মারা যান ২ লাখ ৩৩ হাজার। প্রতি বছর আমাদের দেশে সাড়ে ১২ হাজার নারী জরায়ু মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সাড়ে ৬ হাজার। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় মারা যান একজন। ভয়াবহ এ ক্যান্সার নিয়ে একটি মৌলিক গবেষণায় সফলতা লাভ করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. রেজাউল করিম। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের মাধ্যমে কিভাবে জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন নারীরা সেটি আবিষ্কার করেছেন তিনি। তার এ মৌলিক গবেষণাপত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো থেকে প্রকাশিত মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ক বিশ্বের এক নম্বর জার্নাল প্লোস (পিএসওএস) প্যাথোজেনের ২৩ মে সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। ফলে ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসার নতুন ওষুধ আবিষ্কৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গবেষণার ব্যাপারে ড. করিম বলেন, ভাইরাস বা অন্য কোনো অনুজীব শরীরে প্রবেশ করলে দেহের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাকে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে। দেহে বহিরাগত কোনো কিছু ঢুকলে সেটাকে বের করে দেয়ার
জন্য অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ধরনের মেকানিজমের সাহায্যে সেটিকে ধ্বংস করে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। এজন্য সাধারণ ভাইরাস সংক্রান্ত রোগবালাই একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেরে যায়। কিন্তু সমস্যা হয় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) সংক্রমণের ক্ষেত্রে। এ ভাইরাসটি জরায়ু মুখের ক্যারাটিনাইজড স্কোয়ামাস কোষকে আক্রমণ করে। অন্যান্য ভাইরাসকে ইমিউন সিস্টেম যেমন সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলতে পারে এ ভাইরাসকে তা পারে না। এ অজ্ঞাত কারণে এ ভাইরাসটি শরীরে দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ করে। এ দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের কারণে দেখা দেয় জরায়ুমুখ ক্যান্সার। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পাই, এইচপিভি আক্রান্ত কোষ সিগনালিং পাথওয়েকে বন্ধ করে দেয়। এতে ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বুঝতেই পারে না যে দেহে ভাইরাস ঢুকেছে। এ ভাইরাসটির সংক্রমণে আক্রান্ত কোষে ইউবিকুইটিন কার্বোক্সিল টার্মিনাল হাইড্রোলেজ এল-১ (ইউসিএইচএল১) এনজাইম বেড়ে যায়। এটিই সিগনালিং পাথওয়েকে বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদি ইনফেকশনে সাহায্য করে। শুধু তাই নয় এটি কোষের ক্যান্সার সাপ্রেসর জিনকে অবদমন করে কোষের প্রোটোঅনকোজিনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে ক্যান্সার তৈরিতে সহায়তা করে।
গবেষক ড. রেজাউল করিম বলেন, পরীক্ষাগারে আমরা কিছু ক্যারাটিনাইজড স্কোয়ামাস কোষকে এইচপিভি দ্বারা সংক্রমিত করি। ২৪ ঘণ্টা পর দেখা যায় ওই কোষের ইমিউনিটি সক্রিয় হয়ে জীবাণু ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। ৪৮ ঘণ্টা পর দেখা যায় ওই কোষের ইমিউনিটি একেবারে কমে গেছে ও কোষে ভাইরাস স্থায়িত্ব লাভ করেছে। পরীক্ষাগারে আরো দেখা যায়, ইউসিএইচএল১ এনজাইমের মান কমানো গেলে ভাইরাস আক্রান্ত কোষটির ইম্যুনিটি আবার সক্রিয় হয়ে ভাইরাসকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে। এটাই হবে এ ক্যান্সার চিকিৎসার মূলমন্ত্র। যদি এ এনজাইমের কার্যকারিতা বন্ধ করে দেয় এমন ওষুধ প্রয়োগ করা হয় তাহলে মুক্তি মিলবে জরায়ুমুখ ক্যান্সার থেকে। এটি জরায়ুমুখ ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দ্বার উšে§াচিত করবে বলে বিশ্বাস করেন গবেষক ড. রেজাউল করিম। তার এ গবেষণা উন্নত বিশ্বে বেশ আলোচিত হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি ইতিমধ্যে তার আবিষ্কারের পেটেন্ট করেছেন। আমেরিকা, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি তার এ আবিষ্কারের পেটেন্ট ক্রয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশামত কেঁওয়াবাড়ী গ্রামের আবদুস সালাম ও রাবেয়া বেগমের পুত্র এ মেধাবী অনুজীব বিজ্ঞানী ব্যক্তিগত জীবনে দু’সন্তানের জনক। তার স্ত্রীও গবেষণার কাজ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইক্রোবায়োলজিতে এমএসসি করার পর নেদারল্যান্ডসের ইউথ্রেকথ ইউনির্ভাসিটি থেকে এমএস করেন তিনি। পরে ওই দেশের লাইডেন ইউনির্ভাসিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে এখন তিনি অস্ট্রিয়ার ইনস্টিটিউট অব মলিউকুলার বায়োটেকনোলজিতে গবেষণারত আছেন। বর্তমানে তিনি অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা করছেন। প্রতি বছর দেশের টানে ছুটে আসেন এ বিজ্ঞানী। আসছে নভেম্বরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দেশে আসবেন বলে জানান তিনি। এ গবেষকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে mail.rkarim[at]yahoo.com Link