’১৫ সালের মধ্যে এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার সামর্থ্য হবে দেশের

’১৫ সালের মধ্যে এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার সামর্থ্য হবে দেশের

মন্ত্রিসভায় কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদন্ড ও অন্যূন পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন-২০১৩ চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেন, ২০১৫ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে (এলডিসি) বেরিয়ে আসার সামর্থ্য অর্জন করবে বাংলাদেশ। আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন ও অবস্থান ধরে রাখতে দুটি ধাপে কাজ করা হবে।
বৈঠকে রাজধানীর বিলবোর্ড নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খান বলেন, যত সমালোচনা হোক না কেন বিলবোর্ডে সরকারের সাফল্য প্রচার করতে হবে। তাঁর বক্তব্যে একমত পোষণ করেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন, সাত দিনের জন্য বিল বোর্ডে প্রচারের কথা বলা হয়েছিল। সাত দিন শেষ হয়েছে। এখন এটি বন্ধ থাকবে। তবে মন্ত্রণালয়গুলো পৃথকভাবে বিলবোর্ড ভাড়া নিয়ে প্রচার চালাতে পারে। তিনি বলেন, বিলবোর্ডের প্রচার প্রথমে মানুষ তেমন একটা দেখত না। কিন্তু মিডিয়াতে প্রচারের পর থেকে অনেকে এটি দেখেছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার জানামতে অনেকে গাড়ি নিয়ে ঘুরে ঘুরে এই বিলবোর্ডের প্রচার দেখেছে। এতে মিডিয়ার প্রচারের পর আরও বেশি মানুষে এটা দেখেছে।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কর্মকান্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রণীত একটি কঠোর আইনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। খসড়া আইনে অভিবাসী আইন লংঘনের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রকাশের জন্য ৫ বছরের কারাদন্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, এই আইনে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অপরাধের বিরুদ্ধে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন শর্ত আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, সার-কারখানা চালু করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে গত এপ্রিলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয় কারখানাগুলোয়। আগস্টে চালু করার কথা থাকলেও রমজানের কারণে পিছিয়ে যায়। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে গ্যাস সরবরাহ চালু করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে পেট্রোবাংলা। তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি সূত্র জানায়, পেট্রোবাংলা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশনা দিলেই গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নতুন এ আইন ১৯৮২ সালের অভিবাসন অধ্যাদেশের স্থলাভিষিক্ত হবে। বিদেশে চাকরি প্রত্যাশী ও অভিবাসীদের স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের কল্যাণে জালিয়াতি, প্রত্যারণা ও অবৈধ কর্মকান্ড প্রতিরোধে এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়েরের বিধান রাখা হয়েছে। এতে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া, মামলার গ্রহণযোগ্যতা, জামিন ও ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
এ ছাড়া মন্ত্রিসভা দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বেরিয়ে আনার জন্য জাতিসংঘের এলডিসি সংক্রান্ত চতুর্থ সম্মেলনে গৃহীত ইস্তাম্বুল কর্মসূচী বাস্তবায়নে বাংলাদেশের কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করে। ২০১৫ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে (এলডিসি) বেরিয়ে আসার সামর্থ্য অর্জন করবে বাংলাদেশ। আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন ও অবস্থান ধরে রাখতে দুটি ধাপে কাজ করা হবে। এখনই কিছু ক্ষেত্রে কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। আর এ লক্ষ্য ঠিক রেখে ২০২১ সালের আগেই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে ২৭ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিয়ে গঠিত কমিটি পর্যালোচনা করবে। মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা জানান, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের করণীয় নির্ধারণে ইস্তাম্বুল কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ২০১১ সালের মে মাসে তুরস্কে চতুর্থ জাতিসংঘ এলডিসিভুক্ত ২৫টি দেশের সম্মেলনে তুরস্ক ঘোষণা ও ইস্তাম্বুল কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এর আগে ২০০১ সালে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ব্রাসেলসে। প্রতি ১০ বছর পর পর স্বল্পোন্নত দেশগুলো নিয়ে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এ কর্মপরিকল্পনার অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ভিশন-২০২১ এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
ইস্তাম্বুল কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্য হলো নিজ নিজ দেশে এলডিসি দেশগুলোর কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করা। ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত অর্ধেক দেশ এলডিসি থেকে বের করে নিয়ে আসা। এ লক্ষ্য পূরণে তিনটি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান ভাল। বর্তমানে গ্রোথ ন্যাশনাল ইনকাম (মাথাপিছু আয়) ৯২৩ জলার। আর পৌঁছুতে হবে ১ হাজার ১৯০ ডলারে। ২০০০ হাজার সাল থেকেই অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে ভাল রয়েছে বাংলাদেশ।
তিনি জানান, এছাড়া মানবসম্পদ সূচকে ২০১৩ সালে উত্তরণের কাছাকাছি ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছি। ২০১৫ সালের মধ্যে সব সূচকেই উত্তরণ করতে পারব। তবে প্রকৃত উত্তরণ ঘটবে তারও পরে। কারণ অবস্থান ধরে রাখার বিষয় রয়েছে এ লক্ষ্য পূরণে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ইস্তাম্বুল কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জনে আটটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্ষেত্রগুলো হলো- উৎপাদনশীল সামর্থ্য, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প ও বাণিজ্য পণ্য, মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন, বহুমাত্রিক সঙ্কট ও উদ্ভূত চ্যালেঞ্জসমূহ, উন্নয়নের সামর্থ্য সৃষ্টির জন্য অর্থের যোগান এবং সকল পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করা।
মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা আরও বলেন, এ ক্ষেত্রগুলো উন্নয়নে বাংলাদেশ দুটি ধাপে কাজ করবে। প্রথম ধাপে এলডিসি দেশ হিসেবে কি কাজ করবে, অন্যরা কি কাজ করবে এবং সবাই মিলে কি কাজ করবে তা করা। আর দ্বিতীয় ধাপে কি ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হবে তা নিয়ে কাজ করা হবে। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে ২৫টি দরিদ্র দেশ নিয়ে এলডিসি গঠন করা হয়।