অর্থনীতিতে স্বস্তি

অর্থনীতিতে স্বস্তি

০ বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি
০ ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা থাকবে

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সুস্থির অবস্থায়। রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তি, রফতানি ও রেমিটেন্সের চাঙ্গাভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলে চলতি অর্থবছরেও বাংলাদেশে ছয় শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।
জানা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন নিয়ে নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও গত অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ বিদেশী সাহায্য এসেছে। বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থা ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৭৮ কোটি ৬১ লাখ ডলার ছাড় করেছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে আগের নেয়া ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৮৯ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। তারপরও নিট বিদেশী সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮৮ কোটি ৬৬ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে আর কখনও এক বছরে এই পরিমাণ ঋণসহায়তা ছাড় করেনি দাতারা। নিট সাহায্যের দিক দিয়েও এটি রেকর্ড।
বিদেশী অর্থ প্রবাহের এ গতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চেয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে অনেক টানাপোড়েনের পরও সে ঋণ না নেয়ার কথা সরকার জানিয়ে দিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকে ভেবেছিলেন, পদ্মা সেতুর ঋণ ফিরিয়ে দেয়ার পর বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। আমাদের ফরেন এইড কমে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। উল্টো আরও বেড়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের পাশাপাশি অন্যরাও বেশি বেশি অর্থ ছাড় করেছে।’
মুহিত বলেন, ‘বাংলাদেশ পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থ না নিলেও অন্য তিন প্রকল্পে একই পরিমাণ অর্থ দিচ্ছে তারা। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কোন অবনতি হয়নি।’
অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, বিশ্বব্যাংক না থাকায় দেশের বৃহত্তম এ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো অংশগ্রহণে আগ্রহী হবে না। বিশ্বব্যাংক থাকা অবস্থায়ই এ ধরনের সেতু নির্মাণে বিশ্বের চারটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে সেই চারটি প্রতিষ্ঠানের দুটি কোম্পানি এ সেতু নির্মাণে আগ্রহী হয়ে দরপত্র ক্রয় করেছে। অবশিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানও দরপত্র ক্রয়ের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আশা করছেন তালিকাভুক্ত চারটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানই দরপত্রে অংশগ্রহণ করবে।
তবে তিনি জানান, বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেও কানাডার তদন্তকারী সংস্থা বাংলাদেশের সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রীর বিরেুদ্ধে অভিযোগের কোন সত্যতা পায়নি। এখন মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সম্প্রতি একটি টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, এ অবস্থায় মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের পক্ষে এ প্রকল্পে অংশ নেয়া সম্ভব নয়। তাই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সরকার নিজ অর্থেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দেশের রেমিটেন্স আয়েও উর্ধমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে গত জুলাই মাসে ১২৩ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত বছরের জুলাই মাসের চেয়ে তিন কোটি ডলার বেশি। তাছাড়া গত অর্থবছরের শেষ দুই মাস মে ও জুনে রেমিটেন্স প্রবাহ সামান্য কমে এলেও চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম মাসে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে।
মূলত ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা তাদের পরিবারের কাছে বেশি টাকা পাঠিয়েছেন। এ কারণেই রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে।
রেমিটেন্সের পাশাপাশি রফতানি আয়েও উর্ধমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে রফতানি খাতে প্রায় ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। রানা প্লাজা ধসের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা সত্ত্বেও রফতানি আয়ের এ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। আর এ নিয়ে টানা তিন মাস ধরে দেশের রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম মাসে রফতানি আয় হয়েছে ৩০২ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময় আয় হয়েছিল ২৪৩ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এ হিসেবে আয়ের প্রবৃদ্ধি ২৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ অর্থবছর জুলাইয়ে রফতানি বাবদ ৫৮ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলার বেশি আয় হয়েছে।
রফতানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত নবেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে রফতানি প্রবৃদ্ধি কমছিল। এরপর মার্চে প্রবৃদ্ধি বেড়ে গেলেও এপ্রিলে আবার কমে যায়। তবে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ১৯ দশমিক ৪৪, চলতি বছর জানুয়ারিতে ১৮ দশমিক ৮১ এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল। মার্চ ও এপ্রিলে প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ১৬ দশমিক ২০ এবং ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এছাড়া মে মাসে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৪৩ ও জুনে ১৬ দশমিক ৩১ শতাংশ।
রেমিটেন্স ও রফতানি আয় বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। গত ৫ আগস্ট দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৫৬৮ কোটি ডলার, যা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি।
অর্থনীতির জন্য আরও স্বস্তিদায়ক বিষয় হলো মূল্যস্ফীতির হারের নিম্নমুখী প্রবণতা। রোজার শুরুতে জুলাই মাসে আগের মাসের তুলনায় পণ্যমূল্য বাড়লেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কমেছে।
২০০৫-০৬ অর্থবছরের তথ্যকে ভিত্তি ধরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো মূল্যস্ফীতির যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (গত বছরের জুলাইয়ের সঙ্গে তুলনা করে) ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা জুনে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ গত এক দশক ধরেই ছয় শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে যেখানে প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশে নেমে এসেছে, সেখানে সদ্য সমাপ্ত ২০১২-১৩ অর্থবছরেও বাংলাদেশ ছয় শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলে চলতি অর্থবছরেও বাংলাদেশে ছয় শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত পাঁচ বছরে দেশের অর্থনীতি অনেক পরিণতি লাভ করেছে। এ সময় শুধু মানুষের মাথাপিছু আয়ই বাড়েনি, দ্বিগুণ বেড়েছে বাজেটের আকার। গত পাঁচ বছরে মানুষের মাথাপিছু আয় ৬৭৬ ডলার থেকে বেড়ে ৯২৩ ডলার হয়েছে। এ সময়ে এক লাখ কোটি টাকার বাজেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকায়।