সৌদি আরবে ৪০ লাখ প্রবাসী বৈধতা পাচ্ছেন – বাংলাদেশের ৬ লাখ কর্মীও আছেন

ফিরোজ মান্না ॥ সৌদি আরবে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪০ লাখ প্রবাসী বৈধতা পাচ্ছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের সাড়ে ৬ লাখ কর্মীও রয়েছে। সৌদি বাদশার বিশেষ ক্ষমায় গত ৬ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ বিদেশি কর্মী আকামা পরিবর্তন, পেশা পরিবর্তনের মাধ্যমে বৈধ হয়েছেন। এরপরও আরও প্রায় ২০ লাখ কর্মী তাদের আকামা পরিবর্তন, পাসপোর্ট, ভিসা দিতে পারছিল না বিভিন্ন দেশের দূতাবাস। পরে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অনুরোধে আরও চার মাস সময় বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ ক্ষমার শেষ সময় ৩ নবেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সৌদি সংবাদ মাধ্যম খবর দিয়েছে-সময় বাড়ানোর পর আরও ১০ লাখ প্রবাসীর আকামা পরিবর্তন, পাসপোর্ট, ভিসা বৈধ হয়েছে। কোন ধরনের শাস্তি বা জরিমানা ছাড়াই অবৈধ শ্রমিকদের বৈধ করতে সৌদি বাদশা গত এপ্রিলে ৩ মাসের বিশেষ ক্ষমা ঘোষণা করেন। 
সে দেশের পরিদর্শন ও কাজের পরিবেশ উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি আবু থুনাইন বলেন, সৌদি আরবে মোট ৩৯ লাখ ২২ হাজার ৯২৬ প্রবাসী বৈধতা পেতে সাধারণ ক্ষমা পেয়েছেন। ১১ লাখ ২২ হাজার ১২৫ প্রবাসী তাদের আকামা ঠিক রেখে পেশা পরিবর্তন করেছেন। ১১ লাখ ৮৩ হাজার ২২ জন তাদের ভিসা ঠিক রেখে কফিল (স্পন্সর) পরিবর্তন করেন। এছাড়া ১৬ লাখ ১৭ হাজার ৭৭৯ জন সৌদি বাদশার বিশেষ ক্ষমার মধ্যে তাদের মেয়াদোত্তীর্ণ আকামা ইস্যু ও নবায়ন করতে পেরেছে। নির্মাণ খাতে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক শ্রমিক বৈধ হয়েছে যার পরিমাণ ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৮শ, তার পরের অবস্থানে আছে পাইকারি এবং খুচরা ব্যবসা খাতে। এই খাতে মোট বৈধতা পেয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ১৭২ জন, খাদ্য বিভাগে ৬০ হাজার ৩৩৫ জন এবং শিল্পখাতে ৬০ হাজার ১০১ জন শ্রমিক বৈধ হয়েছে।
এদিকে সৌদি বাদশার বিশেষ ক্ষমায় সৌদিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং কনস্যুলেট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় পৌনে লাখ প্রবাসী বৈধতা পেয়েছেন। সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, ৩ নবেম্বরের আগেই অবৈধ প্রবাসী কর্মীদের বৈধ করা সম্ভব হবে। তবে দূতাবাস বলেছে, সৌদিতে আসলে কত সংখ্যক অবৈধ কর্মী বসবাস করছে তা জানা সম্ভব হয়নি। কারণ অনেক দূরের শহরে বসবাস করে এমন কর্মীদের সংখ্যা এখনও জানা সম্ভব হয়নি। দূরের শহরগুলো থেকে কর্মীরা দূতাবাসে এলে তাদের পাসপোর্ট আগে করে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যাতে একজন কর্মীও বাদ না পড়েন। যারা আউট পাস (দেশে ফিরে আসার পাস) নিয়ে রেখেছিল তাদের অনেকেই আবার সৌদিতে থাকার জন্য সৌদি কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। তাদের বিষয়েও সৌদি কর্তৃপক্ষ নমনীয় রয়েছে। তাদের বৈধ করার ছাড়পত্র দিচ্ছে। 
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সৌদি বাদশাহ বিদেশীদের জন্য ৩ জুলাই পর্যন্ত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। ৩ জুলাইয়ের মধ্যে বিদেশীদের বৈধ হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে অনেক দেশ কর্মীদের কাগজপত্র দিতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি বলে দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সৌদি বাদশার কাছে সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি গিয়ে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। অন্যান্য দেশ থেকেও সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানান। পরে সৌদি বাদশা বিদেশীদের সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ ৩ নবেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। সৌদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সির খবরে বলা হয়, আকামা পরিবর্তনের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে বিদেশি শ্রমিকরা ৪ নবেম্বর পর্যন্ত ভিসা রেখে তাদের পছন্দমতো কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করতে পারবেন এবং যারা অবৈধভাবে সেখানে অবস্থান করছেন, তারা শাস্তি বা জরিমানা ছাড়াই দেশে ফেরার সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কর্মীরা এই সুবিধার আওতায় পড়বেন।
উল্লেখ্য, গত ৪ মে জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ সৌদ আল ফয়সালের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির বৈঠকের পর আকামা পরিবর্তনের সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সৌদি আরব। তবে এই সুযোগের মেয়াদ আরও বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে সৌদি সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়। তেল সমৃদ্ধ সৌদি আরবে প্রবাসী কর্মীদের এক-চতুর্থাংশই বাংলাদেশি। তবে ২০০৯ সাল থেকে দেশটিতে বাংলাদেশীদের কাজের অনুমতিপত্র পরিবর্তনের সুযোগ বন্ধ থাকায় জনশক্তি রফতানি প্রায় বন্ধ রয়েছে।
সৌদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাদশাহ বিদেশীদের বৈধ হওয়ার জন্য নতুন করে যে সময় দিয়েছেন তা শেষ হওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান শুরু করবে। এরপর কারো অনিয়ম ধরা পড়লে তাকে আটক করে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে সবাইকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দেশটির স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত ১৯ জুন সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সাধারণ ক্ষমার সময়সীমা আরও তিন মাস বৃদ্ধির আবেদন জানান। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. নাজিরবিন ওবায়েদ মাদানির সঙ্গে দেখা করে তিনি সময়সীমা বৃদ্ধির এ আবেদনের কথা জানান। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য শ্রমিক প্রেরণকারী দেশ ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনসহ সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরাও সময়সীমা বৃদ্ধির এ আবেদন জানিয়েছেন।