বিদেশী বিনিয়োগ আবারো বিলিয়ন ডলার ছাড়াল

বদরুল আলম | তারিখ: ২৬-০৬-২০১৩

দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ প্রথমবারের মতো বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে ২০০৮ সালে। পরের দুই বছর কিছুটা খারাপ গেলেও ২০১১ সালে তা আবারো শতকোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ আরো কিছু কারণে বিনিয়োগ কমবে বলে আশঙ্কা ছিল অনেকের। তবে বিনিয়োগ বোর্ড সূত্র বলছে, ২০১২ সালেও টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এ বিনিয়োগ।ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড) আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০১৩ আজ প্রকাশ করবে বলে জানা গেছে। সেখানে ২০১২ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের তথ্য তুলে ধরা হবে। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে বিনিয়োগ বোর্ড।তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে ১২৯ কোটি ২৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার; গত বছরের তুলনায় যা ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। এ প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রেখেছে টেলিকম খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো।বিনিয়োগ বোর্ডসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১১ সালে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, বস্ত্র, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, আর্থিক খাত, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। ২০১২ সালেও এ ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। তবে সেলফোন অপারেটরদের টুজি লাইসেন্স নবায়ন বাবদ দেশে আসা অর্থ বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে।বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এখনো বজায় রয়েছে বলে মনে করছেন বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী সদস্য নাভাস চন্দ্র মণ্ডল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য আজ বলতে চাইছি না। তবে আমাদের প্রাথমিক গণনায়ই বিদেশী বিনিয়োগ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে পারায় পরপর দুই বছর এ সাফল্য এসেছে।’২০১১ সালে দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ১১৩ কোটি ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এর আগের দুই বছর অর্থাৎ ২০১০ ও ২০০৯ সালে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯১ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার ও ৭০ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। আর ২০০৮ সালে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ১০৮ কোটি ডলার।পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে আমরা স্বাগত জানাই। টেলিকম খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দেশে আসা অর্থ বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে বলে আমি মনে করি। তবে থ্রিজি প্রযুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরোপিত কর ভবিষ্যতে বিদেশী বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। টেলিকম ছাড়া অন্য যে খাতে বড় ধরনের বিদেশী বিনিয়োগ আসতে পারে, তা হলো পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট, যা উত্পাদনসহ কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে না। তাই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সরকারের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।’দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ আসছে মূলত তিন ধাপে। এগুলো হলো ইকুইটি ক্যাপিটাল, রি-ইনভেস্টেড আর্নিংস ও ইন্ট্রা কোম্পানি লোন। ২০১১ সালের তুলনায় গত বছর ইকুইটি ক্যাপিটাল বেড়েছে ১৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০১২ ও ২০১১ সালে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪৯ কোটি ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ও ৪৩ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার। রি-ইনভেস্টেড আর্নিংস বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। ২০১২ ও ১১ সালে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫৮ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ও ৪৮ কোটি ৯৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। তবে ২০১১ সালের তুলনায় ইন্ট্রা কোম্পানি লোনের পরিমাণ ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে গেছে। ২০১১ সালে এর পরিমাণ ২১ কোটি ৪৯ লাখ ডলার হলেও ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৭৪ লাখ ডলার।২০১২ সালে বিদেশী বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়াকে সুখবর বললেও এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান এমএ তসলিম। তিনি বলেন, পরপর দুই বছর বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে, এটা খুবই ভালো খবর। উন্নত সব দেশের উন্নয়নেই মূল ভূমিকা রেখেছে বিদেশী বিনিয়োগ। বাংলাদেশের জন্যও বিদেশী বিনিয়োগ খুবই প্রয়োজন। তবে দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাবে বলে ধারণা ছিল। এটা ঠিক যে, বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ অবকাঠামো সমস্যা রয়েছে। সেই সঙ্গে জমির অপ্রতুলতাও স্থানীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকেও পিছিয়ে দিচ্ছে। অন্তত একজন বিদেশী বিনিয়োগকারী আছেন, যিনি এসব সমস্যার কারণে ভিয়েতনামে বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়েছেন বলে জনশ্রুতি আছে।২০১১ সালের খাতওয়ারি বিনিয়োগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই বছর বস্ত্র খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ২৭ কোটি ২০ লাখ, ব্যাংকিংয়ে ২৪ কোটি ৯৩ লাখ, জ্বালানিতে ২৩ কোটি ৮২ লাখ, টেলিযোগাযোগে ১৮ কোটি ৯ লাখ ও সিমেন্ট খাতে ৫ কোটি ১৬ লাখ ডলার।সূত্রমতে, ২০১১ সালে দেশে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে মিসর থেকে ১৫ কোটি ২৩ লাখ ডলার। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিনিয়োগ এসেছে ১১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার, নেদারল্যান্ডস থেকে ১১ কোটি ৬৭ লাখ ও যুক্তরাজ্য থেকে ১১ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া ১১ কোটি ৩০ লাখ, হংকং ১০ কোটি ৪৮ লাখ, জাপান ৪ কোটি ৬৫ লাখ, শ্রীলংকা তিন কোটি ১৫ লাখ, ভারত ২ কোটি ৫৭ লাখ ও নরওয়ে ২ কোটি ৪২ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে সে বছর।বিনিয়োগ বোর্ড আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের তালিকায় যেসব প্রতিষ্ঠানকে রেখেছে তার মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন, কোকাকোলা, সুইজারল্যান্ডের লজিটেক, জাপানের মিজুহো ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ, ভারতের সিয়াট, লাভা মোবাইলস ও পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক। এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরুও করেছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। – See more at: http://www.bonikbarta.com/first-page/2013/06/26/6038#sthash.Crijdgzq.dpuf