দারিদ্র্য বিমোচনে অভূতপূর্ব সাফল্য বাংলাদেশের

প্রকাশ : ২১ জুন, ২০১৩ ০০:০০:০০
বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদন
দারিদ্র্য বিমোচনে অভূতপূর্ব সাফল্য বাংলাদেশের
 
নিজস্ব প্রতিবেদক

দারিদ্র্য বিমোচনে গত এক দশকে বাংলাদেশ ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে জানায়, এ সময়ে এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছে। শ্রমমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে আসার কারণেই এ সাফল্য এসেছে। তবে এখনো চার কোটিরও বেশি মানুষ দরিদ্র।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন পর্যালোচনা’ সংক্রান্ত এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য ধরে রাখতে সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে বলে অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি প্রশাসনকে অসম্ভব দুর্নীতিপরায়ণ ও অদক্ষ আখ্যায়িত করে বলেন, ‘পনের কোটি মানুষের প্রশাসন যদি ঢাকামুখী হয়, তবে দুর্নীতি, অদক্ষতা কমানো যাবে না।’ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জোহানেস জাট ছাড়াও বক্তব্য দেন খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য অধ্যাপক সামছুল আলম। প্রতিবেদনের বিশেষ দিক তুলে ধরেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ইফাত শরিফ ও ডেন জোলিফি।

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ চলতি বছরের মধ্যেই জাতিসংঘের সহস াব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এমডিজি) পেঁৗছে যাবে বলে আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭-০৮ সালে বিশ্বমন্দার পরও উল্লেখযোগ্য হারে দারিদ্র্য কমাতে সফল হয়েছে বাংলাদেশ। ২০০০ সালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ছয় কোটি ৩০ লাখ, ২০০৫ সালে তা কমে সাড়ে পাঁচ কোটি এবং ২০১০ সালে আরও কমে চার কোটি ৭০ লাখ হয়। ১৯৯০ সালে ৫৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। এমডিজিতে ২০১৫ সালের মধ্যে তা কমিয়ে ২৮ দশমিক পাঁচ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এক দশকের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আশা করা হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই অর্থাৎ চলতি বছরের শেষনাগাদ এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন করা হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১০ সালের খানা জরিপ ভিত্তি করে। বিবিএসের হিসাবে, ২০০০ সালে দারিদ্র্যের হার ৪৮ দশমিক নয় শতাংশ থেকে ২০১০ সালে ৩১ দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে আসে। পাশাপাশি ২০০০ সালে যেখানে হতদরিদ্র্য মানুষের হার ছিল ৩৪ দশমিক তিন শতাংশ, ২০১০ সালে সেটি কমে ১৭ দশমিক ছয় শতাংশে নেমে আসে। এ হিসাবে ২০০০ সাল থেকে এক দশকে প্রতি বছর গড়ে এক দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমেছে। এর মধ্যে ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত কমেছে গড়ে এক দশমিক ৭৮ শতাংশ। আর ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কমেছে এক দশমিক সাত শতাংশ।

এ সফলতার পেছনে দুটি কারণ তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, শ্রমের মজুরি বৃদ্ধি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে আসার কারণেই সাফল্য এসেছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করছে। তা ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আয় বৃদ্ধি এবং পল্লী এলাকায় বিদ্যুতায়ন ও মোবাইল প্রযুক্তি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। ২০০০ সালে দেশের মোট দরিদ্র মানুষের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ সুবিধা পেত। ২০১০ সালে তা বেড়ে ২৮ দশমিক পাঁচ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০০০ সালে কোনো দরিদ্র মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহারের সামর্থ্য না রাখলেও ২০১০ সালের হিসাবে ৩৬ দশমিক তিন শতাংশ দরিদ্র মানুষ মোবাইল ফোনের সুবিধা পাচ্ছেন। রিকশা, ভ্যান ও কৃষিমজুরি বছরে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিভিন্ন বাধা সত্ত্বেও বিপুল মানুষের দরিদ্রসীমা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টিকে অভূতপূর্ব অর্জন উল্লেখ করে জোহানেস জাট বলেন, ‘এখন করণীয় হচ্ছে যুবশ্রেণীর দক্ষতা বাড়িয়ে তাদের সামাজিক ও উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা।’ অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের প্রশংসা করে বলেন, ‘কখনো কখনো এ ধরনের সমীক্ষা আর্থিক সাহায্যের চেয়েও বেশি অবদান রাখে। সরকারের চার বছরে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও প্রবৃদ্ধি অর্জন ও আয় বৈষম্যে বাংলাদেশ ভালো করেছে। এশিয়ার ছয়টি এবং আফ্রিকার যে ১০টি দেশ ছয় শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি করেছে, সেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ রয়েছে।’ মুহিত বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, স্বাস্থ্য সমস্যার মতো বিষয়গুলো দারিদ্র্য বিমোচনে বাধার সৃষ্টি করে। এ জন্য মানবসম্পদ দক্ষতা বাড়ানো, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’