ওরা দারিদ্র্যজয়ী

টাঙ্গাইলের গোপালপুরের শারমীন আক্তার রিমা, পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার সিংগাড়ি গ্রামের সেলিম, নবীনগর উপজেলার দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামের আল মামুন এবার এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। এছাড়াও জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার হাতিয়ার কামিল মাদ্রাসার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এ দাখিল পরীক্ষায় ছাত্র মেজবাহুল ইসলাম জিপিএ-৫ পেয়েছে। তারা সবাই দিনমজুর পরিবারের সন্তান। তারা ডাক্তার হতে চাইলেও পরিবারের পক্ষে খরচ বহন করা সম্ভব নয়। সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
শারমিন আক্তার : শারমীন আক্তার রিমা চরম দারিদ্র্য জয় করে টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌরশহরের সুতি হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে। সে শহরের সুতি দিঘুলীপাড়া গ্রামের সাবেক সংবাদকর্মী আবু হানিফ ও দর্জি ফাহমিদা বেগমের ছোট মেয়ে। রিমার মা জানান, ২০১০ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে জেএসসি এবং ২০০৭ সালে সুতি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল। সে একজন বড় চিকিৎসক হতে চায়। তাদের বসতভিটা ছাড়া কোনো জমি নেই। মেয়ের গোল্ডেন জিপিএ ৫ পাওয়ার খবর শুনে তারা একদিকে যেমন আনন্দিত অন্যদিকে অর্থাভাবে উচ্চ শিক্ষা হতে বঞ্চিত হওয়ায় আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটচ্ছেন। রিমার বাবা জানান, এখন তার রোজগার নেই। মেয়েকে কোথায় ভর্তি করাবেন সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। অদম্য মেধাবী রিমা জানান, সে একজন বড় চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবে। কিন্তু অর্থের অভাবে হয়তো সে আশা পূরণ নাও হতে পারে। তার বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, সহপাঠী ও প্রতিবেশীরা তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। 
এ কিউ রাসেল গোপালপুর
সেলিম : পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার সিংগাড়ি গ্রামের দিনমজুর বাবার সঙ্গে ইটভাটায় কাজ করে লেখাপড়া করে সেলিম জিপিএ-৫ (গোল্ডেন) পেয়েছে। সে ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন হাই স্কুলের ছাত্র। ভূমিহীন বাবা আলাউদ্দিন ২০০৭ সালে পিত্তথলির অপারেশন করায় ভারী কাজ করতে পারেন না। তারপরও সংসারের প্রয়োজনে বাড়ির পাশের ইটভাটায় কাজ করেন। লেখাপড়ার ফাঁকে সেলিম বাবার কাজে সহযোগিতা করে। সেলিম উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ডাক্তারি পড়ে দরিদ্র মানুষের সেবা করতে চায়। ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহিদুর রহমান জানান, সেলিম স্কুলের মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত। তার ক্লাস রোল ১ ছিল । তার এত ভালো ফলে শিক্ষকরা গর্বিত। সে জেএসসি পরীক্ষায়ও এ প্লাস পেয়েছিল। 
বর্গাচাষি দরিদ্র বাবা আলমগীরের পক্ষে সে ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। বাবা তার ইচ্ছা পূরণে দেশের হৃদয়বান ব্যক্তি বা সরকারি সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করেছেন।
এম এস আলম বাবলু চাটমোহর
আল মামুন : নবীনগর উপজেলার দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামের ইউসুফ মিয়া ও রুফিয়া বেগমের ছেলে আল মামুন সকালে কৃষিকাজ ও বিকালে টিউশনি করার পাশাপাশি লেখাপড়া করে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে ৩ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। মামুন কৃষ্ণনগর আব্দুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ছিল। সে ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু তার বাবার পক্ষে এতবড় পরিবার চালিয়ে লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর টাকার অভাবে ফরম পূরন কঠিন হয়ে পড়ে। তখন শিক্ষকদের সহযোগিতায় এবং প্রাইভেট পড়িয়ে জোগাড় করা টাকায় ফরম পূরণ করা হয়। তার এইচএসসি বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি ও বই কেনার মতো সামর্থ্য নেই। আল মামুনের বাবা ইউসুফ মিয়া জানান, আল-মামুন ছোট বেলা থেকে লেখাপড়ায় ভালো। সে সংসারের অভাবের কারণে নিয়মিত লেখাপড়া করতে পারত না। অল্প কিছু নিজের জমিসহ অন্যদের জমিতে তার সঙ্গে সকালে কৃষিকাজ করে তাকে স্কুলে যেতে হতো। সন্ধ্যায় টিউশনি করত। সে অনেক পরিশ্রম করে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ছেলে ডাক্তার হতে চায়। ছেলের লেখাপড়ার চিন্তায় তার রাতে ঘুম হয় না।
গোলাম মোস্তফা নবীনগর
মেজবাহুল ইসলাম : জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার হাতিয়র কামিল মাদ্রাসার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এ বছর দাখিল পরীক্ষায় মেধাবী ছাত্র মেজবাহুল ইসলাম জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর আগে একই প্রতিষ্ঠান থেকে জেডিসি পরীক্ষায় সে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল। মেজবাহুল ঝামুটপুর গ্রামের হতদরিদ্র বাবা আলমগীর হোসেন ও মা সুরাইয়া নাসরিনের ছেলে। বাবা আলমগীর হোসেন বর্গাচাষি। অন্যের জমি বর্গা চাষাবাদ করেন। এবারে তিনি ৫০ শতক জমি বর্গা চাষ করেছেন। দু’ভাই এক বোনের মধ্যে মেজবাহুল বড়। তার হাই স্কুলে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও অর্থাভাবে তা অপূর্ণ থেকেছে। পড়ার খরচ জোগাড় করতে গ্রামের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের প্রাইভেট পড়াত। সে প্রাইভেট পড়ানোর টাকার কিছু অংশ দিয়ে নিজের জামা-কাপড়সহ ব্যক্তিগত খরচ চালাত। অবশিষ্ট টাকা সংসার চালানোর জন্য বাবার হাতে তুলে দিত। মেজবাহুল ভবিষ্যতে কলেজে লেখাপড়া করে ডাক্তার হতে চায়।
আতাউর রহমান কালাই