এসএসসি ফলাফল বিশ্লেষণ : ৮ বোর্ডের সেরা ১৬০ প্রতিষ্ঠানের ৫৮টিই সরকারি স্কুল : বাণিজ্যনির্ভর স্কুলগুলো ছিটকে পড়েছে

এসএসসি ফলাফল বিশ্লেষণ : ৮ বোর্ডের সেরা ১৬০ প্রতিষ্ঠানের ৫৮টিই সরকারি স্কুল : বাণিজ্যনির্ভর স্কুলগুলো ছিটকে পড়েছে
রাকিব উদ্দিন
সারাদেশের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলো এবার এসএসসি পরীক্ষায় সবচেয়ে ভালো ফল করেছে। ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সেরা ১৬০টি স্কুলের ৫৮টিই সরকারি। গড়ে প্রত্যেক বোর্ডের শীর্ষ ২০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫ থেকে ১০টি সরকারি হাই স্কুল স্থান করে নিয়েছে। পাশাপাশি ক্যাডেট কলেজ, কলেজিয়েট ও পাবলিক স্কুলগুলোও ভালো ফল করেছে। ৮টি বোর্ডে এবার ১২টি ক্যাডেট কলেজ মেধা তালিকায় স্থান অর্জন করেছে।

তবে সেরা তালিকা থেকে এবার ছিটকে পড়েছে বাণিজ্যনির্ভর স্কুলগুলো। এসব প্রাইভেট স্কুল নীতিমালা লঙ্ঘন করে অভিভাবকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা টিউশন ফি নিয়েও ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারেনি। জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী বাণিজ্যনির্ভর স্কুলে ভর্তি হয়ে এবার খারাপ ফল করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) সাবেক মহাপরিচালক প্রফেসর নোমান উর রশিদ সংবাদ’কে বলেন, ‘কিছু বেসরকারি স্কুল আছে, যারা অনেক যাচাই-বাছাই করে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করে। তারাই বোর্ডের সেরা স্থান অর্জন করে। কিন্তু সরকারি স্কুলগুলো সরকারের নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি নিয়ে গুণগত শিক্ষাদান করে থাকে। তাছাড়া সরকারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগও দেয়া হয় মানসম্মত উপায়ে। ফলে সরকারি স্কুল বোর্ডের প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করতে না পারলেও সেরা ২০ প্রতিষ্ঠানে স্থান করে নিতে পারছে’ বলে শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই অধ্যাপক মনে করেন।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ১৬০টি সেরা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৮টিই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এর মধ্যে কেবল রাজধানীর তিনটি স্কুল আছে। দেশে মোট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় আছে মাত্র ৩১৬টি।

শীর্ষস্থান অর্জনকারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ৫টি, রাজশাহীর ৭টি, কুমিল্লার ৮টি, যশোরের ৬টি, চট্টগ্রামের ৭টি, বরিশালের ৮টি, সিলেটের ৭টি এবং দিনাজপুরের ১০টি।

মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় এবার সম্মিলিত মেধা তালিকায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নবম স্থান অর্জন করেছে। গত বছরও এই স্কুলটি বোর্ডের সেরা ২০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল। এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ হাফিজুল ইসলাম সংবাদ’কে বলেন, ‘নিয়মিত ক্লাস নেয়া, ছাত্রদের নিয়মিত ক্লাসে আসতে বাধ্য করা এবং শিক্ষক, ছাত্র ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সাফল্য অর্জন হয়েছে’।

গত কয়েক বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিবারই রাজধানীর কয়েকটি প্রাইভেট স্কুল বোর্ডের সেরা ২০ স্কুলের তালিকায় থাকত। কিন্তু এবার বেশিরভাগ বাণিজ্যনির্ভর স্কুলই ধরাশায়ী। এসব প্রতিষ্ঠান খিলগাঁও, মালিবাগ, গুলশান, উত্তরা, মুহম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী ও বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত।

এবার ক্যামব্রিয়ান স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ৩ পয়েন্ট ৫ পাওয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সংবাদ’কে বলেন, ‘আমার মেয়ে জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিল। কিন্তু প্রতিমাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে পড়িয়েও সে এবার জিপিএ-৫ পায়নি’।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড জানায়, শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এবার ৫টি প্যারামিটার বা চরিত্র নির্ধারক বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করা হয়েছে। এগুলো হলো- নিবন্ধিত প্রার্থীদের মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থীর পাসের হার, শতকরা পাসের হার, মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং প্রতিষ্ঠানের গড় জিপিএ।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সেরা প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের এই প্যারামিটার পরিবর্তন কিংবা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ অনেক ক্ষেত্রে এই প্যারামিটারের ফাঁকফোকর দিয়েও অনেক বাণিজ্যনির্ভর স্কুল কিংবা নির্ধারিত কিছু ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বোর্ডের সেরা স্থান দখল করে নেয়। এতে করে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী পাঠদান করিয়েও সেরা তালিকা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এই সুযোগে এবার রাজধানীর উত্তরার একটি স্কুল মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মঞ্জু আরা বেগম সংবাদ’কে বলেন, ‘সেরা স্কুল নির্ধারণের ক্রাইটেরিয়া (ধরন) পরিবর্তন বা বাড়ানো দরকার। কারণ প্রচলিত এই পদ্ধতির দুর্বলতার সুযোগে অনেক প্রাইভেট স্কুলও সেরা তালিকায় স্থান পাচ্ছে, যা কোনক্রমেই কাম্য নয়’।