পাসের হারে রেকর্ড : এসএসসিতে ১০ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮৯.০৩ ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯১ হাজার ২২৬ জন

নিজামুল হক

দেশের দশটি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৩ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল গতকাল বৃহস্পতিবার একযোগে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফল প্রকাশের ত্রয়োদশ বছরে এবার পাসের হার অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে এ ফল ঘোষণা করেন। এ বছরই প্রথম জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীরা এসএসসিতে অংশ নিয়েছে।

পাসের হার বাড়ার পাশাপাশি জিপিএ-৫ এর সংখ্যা এবারও বেড়েছে। সারাদেশে ১০টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। এ হার গতবারের চেয়ে ২ দশমিক ৬৬ ভাগ বেশি। গতবার পাসের হার ছিল ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। গত চার বছরের পাসের হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ২০১১ সালে ৮২ দশমিক ৩১ শতাংশ, ২০১২ সালে ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

এবার ১০টি বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯১ হাজার ২২৬ জন। গতবারের চেয়ে এ সংখ্যা বেড়েছে ৯ হাজার ১৪ জন। গতবার ১০টি শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৮২ হাজার ২১২ জন। এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৭ হাজার ৩৮১ জন।

প্রতিবারের মতো এবারো শহরের স্কুলগুলোর ভাল ও ঈর্ষণীয় ফলাফল অব্যাহত রয়েছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে সারাদেশে একযোগে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়। গতকাল ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভাল ফল করা স্কুলগুলোতে বাঁধ ভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে কৃতী শিক্ষার্থীরা। ১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের মধ্যেও সকাল থেকেই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিটি স্কুল প্রাঙ্গণ। বাদ্য বাজিয়ে, হৈ-হুল্লোড় করে হাতে হাত রেখে নেচে-গেয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা। পরীক্ষার ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মিষ্টির দোকানগুলোতে মিষ্টি কেনার ধুম লেগে যায়। 

গতকাল সকাল থেকেই শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা কাঙ্ক্ষিত ফলের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অপেক্ষা করতে থাকে। বেলা দুইটায় স্কুলের দেয়ালে দেয়ালে টাঙিয়ে দেয়া হয় ফলাফল। এরপরই অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে ফল জানার জন্য। কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পেরে অনেকের চোখেই আনন্দ অশ্রু দেখা যায়। আবার প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে না পেরে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। 

গতকাল সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফলাফল তুলে দেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। বেলা আড়াইটা থেকে ওয়েবসাইটে ফল প্রকাশ করা হয়। এছাড়া মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর মাধ্যমেও পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার ফল জানতে পারছে। 

ঢাকা বোর্ডে এবার পাসের হার গতবারের চেয়ে বেড়েছে। গতবার এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এবার এ বোর্ডে পাসের হার ৮৭ দশমিক ৩১ শতাংশ।

মাধ্যমিকে এবার সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে রাজশাহী বোর্ডে ৯৪ দশমিক ০৩ শতাংশ। এছাড়া ঢাকা বোর্ডে ৮৭ দশমিক ৩১ শতাংশ, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৮৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, কুমিল্লায় ৯০ দশমিক ৪১ শতাংশ, বরিশালে ৮৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যশোরে ৯২ দশমিক ৬২ শতাংশ, সিলেটে ৮৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ ও দিনাজপুরে ৯০ দশমিক ৬০ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে এসএসসিতে। এছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৮৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ৮১ দশমিক ১৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করে।

এ বছর ১০টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ১৩ লাখ ৫ হাজার ৯৭৩ জন। এর মধ্যে অংশ নেয় ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৩৪ জন। পাস করে ১১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৭৮ জন। এর মধ্যে ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩৮ জন ছাত্র এবং ৫ লাখ ৬০ হাজার ৯৪০ জন ছাত্রী।

এবার ৮ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৪১৭ জন। এর মধ্যে পাস করে ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৯১ জন। এর মধ্যে ৪ লাখ ৪০ হাজার ২৮৪ জন ছাত্র এবং ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৭ জন ছাত্রী। 

পাঁচটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে এবারো সেরা স্কুল নির্ধারণ করা হয়েছে। গতবারের মতো এবারো প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে ২০টি সেরা প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেছে। এবারো এসএসসি পরীক্ষায় সকল বোর্ডের মধ্যে সেরা হয়েছে রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। গত বছর রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ সেরাদের তালিকায় প্রথম হয়েছিল। এবার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল। তৃতীয় অবস্থানে আছে রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এরপরে আছে যথাক্রমে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মীর্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ, মতিঝিল গভ:গার্লস হাইস্কুল, ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, মতিঝিল গভ:বয়েজ হাইস্কুল ও হলিক্রস স্কুল।

এবার শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫ হাজার ৯২টি। গতবার এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৩৭টি। পাশাপাশি শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২২ । গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১৪টি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড:এবার ঢাকা বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেয়া ৩ লাখ ১৭ হাজার ২৬৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৭২৬ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯৪১ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮৫ জন ছাত্রী। 

রাজশাহী বোর্ড:এ বোর্ডে পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৬৫০ জন। উত্তীর্ণ হয় ১ লাখ ৮ হাজার ৯ জন। এর মধ্যে ৫৬ হাজার ৭৮৫ জন ছাত্র এবং ৫১ হাজার ২২৪ জন ছাত্রী। 

কুমিল্লা বোর্ড:কুমিল্লা বোর্ডে ১ লাখ ২৯ হাজার ২০২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ১ লাখ ১৬ হাজার ৩০৭ জন। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ১৮৬ জন ছাত্র এবং ৬১ হাজার ১২১ জন ছাত্রী।

যশোর বোর্ড:যশোর বোর্ডে ১ লাখ ১৯ হাজার ২২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৯ হাজার ৫৫৯ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৮৪৪ জন ছাত্র এবং ৫৩ হাজার ৭১৫ জন ছাত্রী। 

চট্টগ্রাম বোর্ড:এ বোর্ডে ৮৬ হাজার ৫৮৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৬ হাজার ৩৭ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ৩৭৯ জন ছাত্র এবং ৪০ হাজার ৬৫৮ জন ছাত্রী।

বরিশাল বোর্ড:এ বোর্ডে ৬৩ হাজার ৯৭০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৬ হাজার ৩৪৮ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৯২৪ জন ছাত্র এবং ২৮ হাজার ৪২৪ জন ছাত্রী। 

সিলেট বোর্ড:এ বোর্ডে ৫৮ হাজার ৬৭২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫২ হাজার ৪৫ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৪৮৮ জন ছাত্র এবং ২৮ হাজার ৫৫৭ জন ছাত্রী।

দিনাজপুর বোর্ড:এ বোর্ডে ১ লাখ ১ হাজার ৯৪৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯১ হাজার ৮৬০ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৪৭ হাজার ৭৩৭ জন ছাত্র এবং ৪৪ হাজার ১২৩ জন ছাত্রী।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড:এবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০০ জন পরীক্ষার্থী। মোট উত্তীর্ণ হয় ১ লাখ ৯৭ হাজার ১৯৯ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ২ হাজার ৩২৫ জন ছাত্র এবং ৯৪ হাজার ৮৭৪ জন ছাত্রী। 

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড:এ বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেয় ৮৮ হাজার ৩৬০ জন পরীক্ষার্থী। পরীক্ষায় অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৭১ হাজার ৬৮৮ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৫১ হাজার ২২৯ জন ছাত্র এবং ২০ হাজার ৪৫৯ জন ছাত্রী।