নানা অঘটন সত্ত্বেও বাড়ছে পোশাক খাতের রপ্তানি

নানা অঘটন সত্ত্বেও বাড়ছে পোশাক খাতের রপ্তানিমালিকদের লোক দেখানো হা-হুতাশ ধারাবাহিক উন্নতির পরও বঞ্চিত শ্রমিকরাআহমেদ তোফায়েল ভবনধস, অগি্নকা-, শ্রমিক হত্যা ও রাজনৈতিক সহিংসতাসহ নানা সঙ্কটের কারণে পোশাক রপ্তানিতে ধসের আশঙ্কা থাকলেও এ খাতে রপ্তানি আয় দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু পোশাক মালিকদের লোক দেখানো হাহুতাশ কমছে না, কমছে না নানা অভাব-অনুযোগের বয়ান। উপরন্তু এ খাতে আয়ের ধারাবাহিক উন্নতির পরও বঞ্চিত হচ্ছেন শ্রমিকরা। 
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস (জুলাই-মার্চ) সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। উপর্যুপরি হরতাল সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটির কারণে মার্চ মাসের ২৪ দিন উৎপাদন ও শিপমেন্টে ক্ষতির শিকার হয়েছে পোশাক শিল্প খাত। একইভাবে এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে ১০ দিনই একই ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তবে এসব সত্ত্বেও পোশাক খাতের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি থেমে নেই। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রপ্তানি যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। 
সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির খাত থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে ১০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন 
ডলার। 
২০১১-১২ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এর পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একের পর এক সঙ্কট লেগেই রয়েছে দেশের প্রধান রফতানি খাত গার্মেন্ট শিল্পে। গত নভেম্বরে আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাশনস কারখানায় অগি্নকা-ে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাপে ফেলেছিল এ শিল্পকে। এরপর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা থামিয়ে দিয়েছে গার্মেন্ট শিল্পের অগ্রগতি। সর্বশেষ সাভারের রানা প্লাজা ধসে ছয় গার্মেন্ট কারখানার শতাধিক শ্রমিক নিহত এবং সহস্রাধিক শ্রমিক আহত হওয়ার ঘটনা এ সঙ্কট আরো বাড়িয়ে দিল।
পোশাক খাত মালিকরা বলছেন, এমনিতেই রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তার ওপর সাভারের ঘটনায় বাংলাদেশের বাজার নিয়ে ক্রেতারা নতুনভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করবেন। বিজিএমইএর তথ্যনুযায়ী, সামপ্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে রফতানি আদেশ বাতিল করেছেন ২৫.৬৫ লাখ ডলারের। এছাড়া ১১.৩২ লাখ ডলারের ডিসকাউন্ট, ৩০.৪৭ লাখ ডলারের এয়ারশিপমেন্ট এবং ৯২.৮১ লাখ ডলারের শিপমেন্ট বিলম্বিত হয়েছে। গার্মেন্ট শিল্পে এ ধরনের সঙ্কট চলছে কয়েক মাস ধরে। এ কারণে ওয়ালমার্ট, নাইকি, সিঅ্যান্ডএম ও গ্যাপসহ বিশ্বের বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে রফতানি আদেশ প্রত্যাহার শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, এসব ক্রেতা নতুন করে আর রপ্তানির আদেশও দিচ্ছে না বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের কাছে।
গত নভেম্বরে তাজরিন কারখানায় অগি্নকা-ে ১১২ শ্রমিক নিহত হওয়ার পর বিদেশি ক্রেতারা বড় ধরনের চাপ দিয়েছিল গার্মেন্ট শিল্প মালিকদের শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য। কিন্তু সেই ঘটনার পর বিজিএমইএ এবং সরকার লোক দেখানো তদন্ত করে আজ পর্যন্ত ওই কারখানার মালিক বা দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেনি। এরও আগে শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকা-ে আরেক দফা নাড়া দিয়েছিল গার্মেন্ট শিল্পকে। এসব বিষয় নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও শ্রমিক সংগঠনের পাশাপাশি ক্রেতাদের চাপ এখনো অব্যাহত আছে।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, নানা সমস্যার মধ্যেও রপ্তানি রাড়ছে সত্যি কিন্তু গার্মেন্ট শিল্পে একটির পর একটি সঙ্কট লেগেই রয়েছে। এরই মধ্যে সাভারের ঘটনা সঙ্কট আরো বাড়িয়ে দিল। এতে কোনো সন্দেহ নেই, এ ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের আরো চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেবে। তবে আমাদের প্রত্যাশা, সব সঙ্কট কাটিয়ে এগিয়ে যাবে গার্মেন্ট শিল্প।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এ বিষয়ে বলেন, দেশের গার্মেন্ট শিল্প ভয়ঙ্কর নাজুক অবস্থায় আছে। সাভারের ঘটনা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অবস্থা আরো নাজুক করে তুলবে। দেশের প্রধান রফতানি খাতটিকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা নিজেরাই। এ অবস্থা চলতে পারে না। যে শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমে মালিকরা ডলার কামান, গাড়ি-বাড়ি করেন, একটি কারখানা থেকে ১০টি কারখানা করেন সে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা না দিতে পারলে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। তিনি আরো বলেন, এ ঘটনায় আমেরিকার বাজারে জিএসপি সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে যে উদ্যোগ চলছে তা-ও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাভারে ভবন ধসের বিয়োগান্ত ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে। অসংখ্য প্রাণহানি আর হতাহতের ঘটনায় সরকারের পক্ষে এটিকে আর নিছক দুর্ঘটনা বলার সুযোগ নেই। বরং এ ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে শ্রমিকের নিরাপত্তায় সরকার আন্তরিক।
ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বাংলাদেশের জিএসপি-ভাগ্য নির্ধারণে সাভারের ভবনধসের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। কারণ, জিএসপির শুনানিতে শ্রমিকদের সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ। যদিও সরকার মনে করে, গত মার্চের শুনানির পর যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত নতুন ১৯টি প্রশ্নের যথেষ্ট ভালো জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া সমপ্রতি শ্রম আইন সংশোধন করে পোশাক শিল্পের কর্মীদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার দেয়ায় বাংলাদেশের জিএসপি অব্যাহত রাখার পথ সুগম হবে।
তবে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডবিস্নউ মজিনা বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, কর্মপরিবেশের প্রেক্ষাপটে সাভারের ভয়াবহ দুর্ঘটনা জিএসপির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলবে। 
জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, শুনানির পর যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত নতুন ১৯টি প্রশ্নের উত্তর ২৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়েছে। সার্বিকভাবে যে বিষয়গুলোতে তাদের উদ্বেগ ছিল, তা নিয়ে সরকারের অবস্থান খুব স্পষ্ট করেই জানানো হয়েছে।
সাভারের ভবনধসের ঘটনা মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে রাষ্ট্রদূত ড্যান ডবিস্নউ মজিনার বক্তব্যের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানিয়েছেন বাংলাদেশের বাণিজ্য সচিব। 
গত মার্চের শুনানিতে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের পক্ষে অংশগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, সাভারের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে হলে ওই ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এটি হলেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ বার্তা যাবে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সরকার প্রকৃত অর্থেই আন্তরিক।
তিনি বলেন আসলে ২০২১ সালের মধ্যে পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করার যে টার্গেট নিয়ে আমরা এগোচ্ছিলাম, তা হোঁচট খেয়েছে। সামপ্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতায় বিদেশি ক্রেতারাও আতঙ্কিত। তারা বাংলাদেশে আসতে চাচ্ছেন না। সমপ্রতি রাশিয়া থেকে আসা দুই ক্রেতা নিরাপত্তার অজুহাতে বিমানবন্দর থেকেই দেশে ফেরত চলে গেছেন। অনেক ক্রেতা কার্যাদেশও বাতিল করেছেন।