দ্রুততম সময়ে উন্নতি করা ১৮ দেশের অন্যতম বাংলাদেশ

দ্রুততম সময়ে উন্নতি করা ১৮ দেশের অন্যতম বাংলাদেশ
কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে ॥ ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন
 
অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ মানব উন্নয়ন সূচকে ১৮৭টি দেশের মধ্যে ১৪৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে দ্রুততম সময়ে উন্নতি করা বিশ্বের ১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে এমন তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ তার ধীরগতির অর্থনৈতিক অগ্রগতি আর ভারতের তুলনায় অর্ধেক আয় নিয়েও প্রায় ভারতের সমান উন্নতি করেছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নতির মাপকাঠিতে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে পাকিস্তানের অনেক সূচক থেকেও এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, যে ধরনের ব্যতিক্রমধর্মী সঙ্কট বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হয় তার তুলনায় বাংলাদেশের উন্নতি সত্যিই অসামান্য। 
শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচীর (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৩ ‘দক্ষিণের উত্থান ঃ বৈচিত্র্যময় বিশ্বে মানব অগ্রগতি’ প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর পলিন ট্যামেসিস, ইউএনডিপির সহকারী কান্ট্রি ডিরেক্টর কেএএম মোরশেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম হারমাছি। 
জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দ্রুততম সময়ে উন্নতি করা বিশ্বের ১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যে ১৮টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হচ্ছে তার মধ্যে চীন, ভারত, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনামের মতো দেশের নামও রয়েছে। ২০১৩ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশকে ১৮৭টি দেশের মধ্যে ১৪৬তম অবস্থানে দেখানো হয়েছে। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, বাংলাদেশ তার ধীরগতির অর্থনৈতিক অগ্রগতি আর ভারতের তুলনায় অর্ধেক আয় নিয়েও প্রায় ভারতের সমান উন্নতি করেছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নতির মাপকাঠিতে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। এতে বলা হচ্ছে, দেশগুলোর এসব সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকতেই হবে, এমনকি আসছে দশকে তার গতিকে বাড়িয়ে দিতে হবে বহুগুণ। প্রতিবেদনের মূল প্রবন্ধে ইউএনডিপির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেলেন ক্লার্ক বলেছেন, শত বছরের মতো এই প্রথম সমন্বিতভাবে সমগ্র দক্ষিণ সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। 
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বস্ত্রশিল্পে অসামান্য সাফল্য লাভ করে এবং ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাংলাদেশ তার অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে পেরেছে। ১৯৯০ সালের ০.৮ শতাংশ থেকে শুরু করে ২০১০ সালে বিশ্বের প্রায় ৪.৮ শতাংশ পোশাক রফতানি করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ প্রসঙ্গ তুলে ধরে ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর পলিন ট্যামেসিস বলেন, যে ধরনের ব্যতিক্রমধর্মী সঙ্কট বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হয় তার তুলনায় বাংলাদেশের উন্নতি সত্যিই অসামান্য। পলিন ট্যামেসিস আরও বলেন, অগ্রসরমান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে তুলনা করে যে বিষয়টির ওপর আমি বেশি গুরুত্ব দিতে চাই সেটি হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের উন্নতি এবং অগ্রগতি তার অর্থনৈতিক অর্জনের চেয়েও অনেক শক্তিশালী। এইচডিআইয়ের ক্রমবৃদ্ধি দিয়ে দেখলে এদেশের সার্বিক অগ্রগতি সত্যিই ব্যতিক্রমধর্মী। যা ১৯৮০ সালের ভিত্তিতে ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। 
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ধারায় বড় রকমের পরিবর্তন ঘটিয়ে নজিরবিহীন ইতিহাস তৈরি করেছে বাংলাদেশ, ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর উন্নয়ন। লাখ লাখ মানুষ অভাবের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে আর কোটি কোটি লোক ঠাঁই করে নিয়েছে দক্ষিণের দ্রুতবর্ধিষ্ণু নব্যমধ্যবিত্তের সারিতে। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, মানব-উন্নয়ন সূচকের হিসেবে গত এক দশকে সব দেশেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আয়ের মাত্রার ক্ষেত্রে অর্জন অনেকাংশই বেড়েছে। এতে বলা হয়, এসব দেশে ২০০২ সালের তুলনায় ২০১২ সালে মানব উন্নয়ন সূচক খুব দুর্বল ছিল। যেসব দেশে মানব উন্নয়ন সূচক দুর্বল ছিল সেসব দেশ ঐ সূচকের বিচারে দ্রুত অগ্রগতি লাভ করেছে। এতে বলা হয়, ২০২০ সাল নাগাদ ব্রাজিল, চীন এবং ভারত এই তিনটি নেতৃস্থানীয় উন্নয়নশীল দেশের মোট উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমষ্টিগত উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যাবে বা মোট জিডিপির পরিমাণ সমান হতে যাচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে নতুন বাণিজ্য আর প্রযুক্তির অংশীদারিত্বই এই প্রসারণের মূল চালিকাশক্তি বলে উল্লেখ করা হয়। 
উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা টেকসই করার জন্য ২০১৩’র প্রতিবেদনটি চারটি নির্দিষ্ট বিষয় শনাক্ত করেছে; লিঙ্গ সমতার নিশ্চয়তাসহ ন্যায্যতার সম্প্রসারণ, তরুণসমাজ তথা সকল নাগরিকের অভিমত প্রকাশ ও অংশগ্রহণের অধিকতর সুযোগ নিশ্চিত করা, পরিবেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা এবং জনমিতিক পরিবর্তন সামলানো। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৈশ্বিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলোর প্রকৃতি ক্রমেই জটিল আর আন্তঃদেশীয় রূপ নিচ্ছে। বাণিজ্য, অভিবাসন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কারণে দেশগুলোর পারস্পরিক সংযুক্তি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, একটি দেশের নীতি অন্যদেশের ওপর যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে তা আজ সর্বজনবিদিত। এর কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়, সাম্প্রতিককালে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনে ক্ষতিকর প্রভাবের জন্য দায়ী খাদ্য, অর্থনীতি বা জলবায়ুজনিত সঙ্কট। 
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বৈশ্বিক উৎপাদনে যেভাবে পুনঃভারসাম্য এসেছে তা গত ১৫০ বছরে দেখা যায়নি। সীমান্ত অতিক্রম করে পণ্য, সেবা মানুষ ও ধারণার চলাচলের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। ২০১১ সাল নাগাদ বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে বাণিজ্য থেকে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। ১৯৮০ থেকে ২০১০ সময়কালের মধ্যে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে তাদের ন্যায্য দাবি ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ শতাংশ হয়েছে। এক্ষেত্রে উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোর পরস্পরের সঙ্গে দক্ষিণ-দক্ষিণ বাণিজ্য বিশ্ব বাণিজ্যের ৮.১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬.৭ শতাংশ। 
প্রতিবেদনটির সার সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়, বড় দেশগুলো ছোট দেশগুলোর ওপর প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করে- যা অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ ও শিল্পায়নকে থামিয়ে দিতে পারে। এতে বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ২০১০-এর মধ্যে ১০৭টি দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, তার মধ্যে প্রায় শতকরা ৮৭ ভাগ দেশ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মিশে গেছে। দেশগুলোর বাণিজ্য-উৎপাদন অনুপাত হারে বেড়েছে। এতে দেখানো হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর চার-পঞ্চমাংশই ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তাদের উৎপাদন-বাণিজ্য অনুপাতে অগ্রগতি ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৩ ‘দক্ষিণের উত্থান : বৈচিত্র্যময় বিশ্বে মানব অগ্রগতি’ এমন ৪০টি দেশের কথা বলছে যেসব দেশের মানুষ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাক লাগানোর মতো উন্নতি করতে পেরেছে। প্রতিবেদনটিতে এসব দেশের জাতীয় পর্যায়ের প্রতিশ্রুত উন্নততর জনস্বাস্থ্য এবং শিক্ষা সেবা, দারিদ্র্যবিমোচন উদ্ভাবনী কর্মসূচী ও বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে তাদের কৌশলগতভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সাফল্যকে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক অনুসারে, আয়-নির্ভর দারিদ্র্য অনুমানের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতেই বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে পতিত মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অনুপাতে বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশের হার সবচেয়ে বেশি (৫৮ শতাংশ)। ভারতে এই হার ৫৪ শতাংশ, পাকিস্তানে এই হার ৪৯ এবং নেপালে এই হার ৪৪ শতাংশ। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি আর ভারতের তুলনায় অর্ধেক আয় নিয়েও প্রায় ভারতের সমান উন্নতি করেছে। পাকিস্তানের অনেক সূচক থেকেও বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। ইউএনডিপির সহকারী কান্ট্রি ডিরেক্টর কেএএম মোরশেদ বলেন, মানব উন্নয়ন নির্ধারণ সূচীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উপাদান-স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এই তিন ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। বক্তারা প্রতিবেদনের বাংলাদেশ এবং অগ্রসরমান অন্যান্য অর্থনৈতিক শক্তিসমূহের অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুর্বলতাগুলোর দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসমূহের সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য আর লিঙ্গ বৈষম্যও এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রসঙ্গত, ঢাকায় এই প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচনের বারো ঘণ্টা আগে মেক্সিকো সিটিতে ইউএনডিপির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেলেন ক্লার্ক এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতো মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন করেন।