কলেরা প্রতিরোধে ফারুকের আবিষ্কার

কলেরা প্রতিরোধে ফারুকের আবিষ্কার

আশীফ এন্তাজ | তারিখ: ২১-০১-২০১৩

আমাদের এই কলেরাপ্রবণ দেশে কলেরা নিরাময় ও প্রতিরোধে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন শাহ্ এম ফারুক।
প্রাকৃতিক পানিতে থাকা এক ব্যাকটেরিয়ার নাম ‘ভিব্রিও কলেরি’। আগে ধারণা করা হতো, এর কারণে মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়। পরে জানা গেল, এই ব্যাকটেরিয়া নিজে নিরীহ। কিন্তু কিছু ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে এটা পরিণত হয় কলেরার জীবাণুতে। গবেষণা করে বিষয়টা আবিষ্কার করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) তৎকালীন মলিকিউলার জেনেটিকসের প্রধান শাহ্ এম ফারুক। তাঁর এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্র ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর প্রকাশিত হয় বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ। এই খ্যাতনামা বিজ্ঞান সাময়িকীতে এর আগে বাংলাদেশের কোনো গবেষকের গবেষণাপত্র এত গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়নি। এই গবেষণায় দলনেতা শাহ্ ফারুকের সঙ্গে ছিলেন তাঁর তিন সহকর্মী—ফায়জুল হাসান, এম কামরুজ্জামান ও জন জে ম্যাকালেনাস। শাহ্ এম ফারুক ২০০৫ সালে দ্য একাডেমি অব সায়েন্সেস ফর দ্য ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ডের (টিডব্লিউএএস) বর্ষসেরা বিজ্ঞানীর পুরস্কারও পেয়েছেন।
শাহ্ এম ফারুক বললেন, আগে মনে করা হতো, এই ব্যাকটেরিয়ার কারণেই মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়। কিন্তু আমাদের গবেষণায় বেরিয়ে আসে, ব্যাপারটা এত সরল নয়। সব ভিব্রিও কলেরি ব্যাকটেরিয়া কলেরার সংক্রমণ ঘটায় না। পানিতে থাকা ভিব্রিও কলেরি আক্রান্ত হতে পারে অন্য নানা ধরনের ভাইরাসে। এটা যখন অন্য ভাইরাসের সংস্পর্শে আসে, তখন তার চারিত্রিক কিছু পরিবর্তন ঘটে। ফলে এটি চার থেকে পাঁচ ধরনের ক্ষতিকর ভাইরাসের আক্রমণে সত্যিকারের কলেরার জীবাণুতে পরিণত হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়, কলেরার জীবাণুর বিবর্তনের সর্বশেষ পর্যায়ে টিএলসি ও সিটিএক্স ভাইরাস ভিব্রিও কলেরির ক্রোমোজোম পরিবর্তন করে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
কলেরার জীবাণু নিয়ে শাহ্ ফারুকের এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কী? তাঁর ভাষায়, এটার একাডেমিক গুরুত্ব অনেক। সাধারণত দেখা যায়, একটা ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে যেটা সত্যি, অন্য দশটা ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়া সত্যি হতে পারে। তিনি বললেন, ‘এই পর্যবেক্ষণ অন্য গবেষকদের জন্য পথনির্দেশক হতে পারে। সহজ ভাষায়, কলেরার আরও উন্নত প্রতিষেধক তৈরিতে এই গবেষণা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কোনো এলাকার পানি বিশ্লেষণ করে যদি এই ক্ষতিকর জীবাণুদ্বয়ের সহাবস্থান পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে কলেরা প্রতিরোধে আরও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, যেটা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও মজবুত ও নিরাপদ করবে।’
১৯৫৬ সালে যশোরে জন্ম বিজ্ঞানী শাহ্ এম ফারুকের। তাঁর বাবা আবদুল মান্নান ও মা মালেকা শাহানা। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়েছেন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে। ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিং থেকে মলিকিউলার বায়োলজিতে পিএইচডি ডিগ্রি নেন। ১৯৮৪ সালে তিনি ঢাকায় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে আইসিডিডিআরবিতে যোগ দেন।
শাহ্ ফারুক টিডব্লিউএএস ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো। এ ছাড়া পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব ইনফেকসাস ডিজিজের সদস্যপদ। বর্তমানে তিনি আইসিডিডিআরবিতে খাদ্য ও পানিবাহিত রোগ কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।
শাহ্ ফারুক শোনালেন আশার কথা। কলেরা রোগে সারা বিশ্বে অনেক মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশেও কলেরায় আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপক। কিন্তু সারা বিশ্বে কলেরাই খুব সম্ভবত একমাত্র ঘাতক ব্যাধি, যেটাকে বাংলাদেশ সবচেয়ে সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করছে। ফলে কলেরার চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে এগিয়ে। এ জন্যই নিজের আবিষ্কার দুনিয়ায় সাড়া ফেলার পর ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাহ্ ফারুক বলেছিলেন, ‘এখানে একটা কথা প্রচলিত আছে, আমাদের কলেরা হাসপাতালে যদি কোনো কলেরা রোগী জীবিত অবস্থায় আসে, তাহলে মোটামুটি নিশ্চয়তা দেওয়া যায় যে সে বেঁচে যাবে।’
কাজেই কলেরার ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের বাস্তব চিত্র অন্য রকম। ভারত, সাবসাহারা আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, মোজাম্বিক, দক্ষিণ আমেরিকার অনেক মানুষই কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, সেখানে বাংলাদেশে কলেরায় মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম। শাহ্ ফারুকদের বিজয়যাত্রা অব্যাহত থাকলে, এটি নিশ্চিতভাবে শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।