বিশ্ববাজারে দেশীয় হোম টেক্সটাইলের কদর বাড়ছে

 

 

বাংলাদেশের প্রথম সারির রপ্তানি পণ্যের মধ্যে হোম টেক্সটাইল একটি। মানসম্মত পণ্যের কারণে বিশ্ববাজারে দেশীয় এসব পণ্যের কদর বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় শত কোটি ডলার ছুঁয়ে যেতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
বর্তমানে সারা বিশ্বে হোম টেক্সটাইলের প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলারের বাজার আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ইউনিয়নের দেশগুলোই সিংহভাগ হোম টেক্সটাইল আমদানি করে থাকে, যা বৈশ্বিক বাজারের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। আর এসব পণ্যের অন্যতম রপ্তানিকারক দেশ চীন ও ভারতের উদ্যোক্তারা এ খাত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন। তাঁরা এখন উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য উৎপাদনে মনোযোগী হচ্ছেন।
এই অবস্থা বাংলাদেশের জন্য বিরাট সুযোগ বয়ে এনেছে বলে মনে করছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। তাঁরা বলছেন, বিদেশ থেকে প্রচুর কার্যাদেশ আসছে, কিন্তু জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ আর কম সুদে ব্যাংকঋণ পেলে আগামী পাঁচ বছরে হোম টেক্সটাইল খাতের রপ্তানি আয় কয়েক গুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তাঁরা। 
জানা যায়, আইকিয়া, ক্যারিফোর, অ্যাসডা, লিটল উড, মরিস ফিলিপস, ওয়াল-মার্ট ও রেডক্যাটের মতো ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় খুচরা বিপণি সংস্থাগুলো বাংলাদেশ থেকে হোম টেক্সটাইলের বিভিন্ন সামগ্রী আমদানি করছে। এভাবে চাহিদা বাড়তে থাকায় দেশীয় উৎপাদকেরাও তাঁদের উৎপাদনের পরিসর বাড়াচ্ছেন, যাচ্ছেন বড় ধরনের শিল্প সম্প্রসারণে। তবে দেশে ওভেন বা নিট পোশাকের তুলনায় হোম টেক্সটাইলের কারখানা খুবই কম।
জানা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৫টি প্রতিষ্ঠান হোম টেক্সটাইল উৎপাদন করছে। তবে এর মধ্যে রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স, সাদ গ্রুপ, অলটেক্স, এসিএস টেক্সটাইল, রিজেন্ট, জেকে গ্রুপ, ক্লাসিক্যাল হোম প্রভৃতি। প্রতিষ্ঠানগুলো হোম টেক্সটাইলের মধ্যে বিছানার চাদর ও আচ্ছাদন, বালিশের চাদর, তাকিয়া, ছোট গালিচা, পর্দা, ছোট তোশক, দস্তানা, টেবিলের চাদর ইত্যাদি উৎপাদন ও রপ্তানি করছে। বাংলাদেশে হোম টেক্সটাইলের নেতৃত দিচ্ছে নোমান গ্রুপের জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স। আন্তর্জাতিকভাবে হোম টেক্সটাইলের বাজারে অবস্থান করে নেওয়ার প্রত্যয় থেকে ১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান। ২০০০ সালের মার্চ মাস থেকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যায়। ঢাকার অদূরে টঙ্গীতে অবস্থিত জাবের অ্যান্ড জুবায়ের একটি সমন্বিত কারখানা। এতে আছে নিজস্ব স্পিনিং, উইভিং, প্রিন্টিং ও ডায়িংয়ের ব্যবস্থা।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ইতিমধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করেছে। গত বছর ১৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের সাদ মুসা গ্রুপ ১৯৯৪ সালে যাত্রা শুরু করলেও হোম টেক্সটাইল রপ্তানি শুরু করে আরও চার বছর পর। বর্তমানে এই গ্রুপের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি চার কোটি ২০ লাখ ডলার রপ্তানি করে। এ বছর তা বেড়ে চার কোটি ৮০ লাখে দাঁড়াবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
এক যুগ আগেও বিশ্ববাজারে হোম টেক্সটাইল পণ্য বলতে ক্রেতারা বুঝতেন চীন, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্ক। এখন এসবের পাশাপাশি বাংলাদেশের নাম যুক্ত হয়েছে। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে হোম টেক্সটাইল রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল সাড়ে ১৫ কোটি ডলার। আর সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছরে এই রপ্তানি আয় বেড়ে প্রায় ৯০ কোটি ৬০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে হোম টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে গত পাঁচ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে নভেম্বর সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০ কোটি ৯৫ লাখ ডলার।
তবে হোম টেক্সটাইল খাতের জন্য তুলার দাম ও জোগানই সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে জানান উদ্যোক্তরা। চীন, ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে এখানেই। তারা নিজেরাই ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ উৎপাদন খরচ সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নিজস্ব তুলার জোগান থাকার কারণে। আর বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হয় বিশ্ববাজারের দামের ওঠানামার ওপর। কারণ বাংলাদেশের তুলার চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে মেটানো সম্ভব। বাকি ৯৮ শতাংশই আমদানি করতে হয়।
এ বিষয়ে নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, ‘তুলা মৌসুমি পণ্য হওয়ায় আমাদের পাঁচ থেকে ছয় মাসের তুলা একসঙ্গে আমদানি করতে হয়। এতে বিপুল পরিমাণ টাকা আটকে যায়। উচ্চহারে ব্যাংকঋণের সুদ গুণতে হয়। তা ছাড়া তুলা আমদানিতে ৫ শতাংশ আমদানি খরচ হয়। এসব কারণে আমাদের পণ্যের দাম যায় বেড়ে।’
তবে তুলার সমস্যাটি বড় করে দেখতে চান না নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস-বিদ্যুৎ পেলে এটি প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াত না। এসবের সঙ্গে ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানো গেলে এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি করতে পারলে এই খাতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
সাদ মুসা গ্রুপের পরিচালক শেখ হাসান জামান বলেন, হোম টেক্সটাইলের অবস্থা তৈরি পোশাক খাতের চেয়ে ভালো। ব্যাপক চাহিদা থাকায় সবগুলো প্রতিষ্ঠানই উৎপাদনক্ষমতা শতভাগ বাড়াতে শুরু করেছে।