চকোলেট আপার পাঠশালা

ঈশ্বরদীর একটি গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলগামী করতে ‘চকোলেটের লোভ’ দেখিয়ে গত দু’বছর ধরে অন্ধকার গ্রামে আশার আলো ছড়িয়ে চলেছেন এক গৃহবধূ। নিজে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত না হয়ে, কোনো স্কুলের শিক্ষক না হয়েও ঈশ্বরদীর মুলাডুলি ইউনিয়নের রেজানগর গ্রামের গৃহবধূ চায়না বেগম এখন এলাকায় ‘চায়না ম্যাডাম’ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। এ গ্রামের ৪ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুদের কেউ কেউ তাকে ‘চকোলেট ম্যাডাম’ কিংবা ‘চকোলেট আপা’ বলেও ডাকেন। এলাকার হতদরিদ্র গ্রামবাসীরা জানান, চায়না ম্যাডাম উদ্যোগ না নিলে তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করা সম্ভব হতো না। 
সংসারের গৃহস্থালি কাজের মধ্যেই নির্দিষ্ট সময় বের করে নিয়ে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত দরিদ্র শিশুদের মাতৃস্নেহে লিচু বাগানে 

চট বিছিয়ে শিক্ষাদান করে চলেছেন চায়না বেগম। দুই বছর ধরে গৃহবধূ চায়নার এ উদ্যোগ রেজানগর গ্রামের মানুষের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। চায়না নিজে খুব বেশি শিক্ষিত নন, আবার তার পারিবারিক অবস্থাও খুব একটা সচ্ছল নয়। চায়না বেগম জানান, বাবার পরিবারে অসচ্ছলতার কারণে লেখাপড়া করতে পারেননি তিনি। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরুতে না পেরুতেই গ্রামীণ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন পরিবেশগত কারণে অল্প বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। বাবার সংসার ও স্বামীর সংসারের আর্থিক অনটনের কাছে পরাজিত হয়ে নিজে শিক্ষিত হতে পারেননি। তবে চায়না বেগম তার ছেলে ও মেয়েকে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করেছেন।
ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি নওশাদ আলী জানান, প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চায়না বেগমের মতো নারীদের পাশে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজনীন হোসেন বলেন, গ্রামের অবহেলিত শিশুদের স্কুলগামী করতে চায়না বেগমের ভূমিকা খুবই প্রশংসনীয়। 
শিশুদের বিনা পারিশ্রমিকে পাঠদান করানোর উদ্দেশ্য কী, এমন প্রশ্নের উত্তরে চায়না বেগম বলেন, এই গ্রামের অবহেলিত শিশুদের স্কুলমুখী করে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং গ্রামীণ সমাজকে অপরাধমুক্ত করে তোলাই আমার মূল উদ্দেশ্য। এ জন্য সমাজের বিত্তশালী মানুষদের সহযোগিতা পেলে নিজ বাড়ির আঙিনায় প্রি-প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে শিশুদের শিক্ষা প্রদান করার ইচ্ছা আছে আমার। আমার এই আহ্বান যদি সমাজের একজন মানুষের কানেও পেঁৗছায়, তাহলেই আমি নিজেকে সার্থক মনে করব।