সত্যিকারের বাঘ দেখছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ

খুলনায় পা রেখে ড্যারেন স্যামি বলেছিলেন, সময় পেলে সুন্দরবনে বাঘ দেখতে যাবেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়কের বোধহয় আর সুন্দরবন যাওয়ার দরকার হচ্ছে না। হবে কী করে? শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে বসেই যে বাঘদর্শন হয়ে গেল তার! দল-বল নিয়ে ঢাকা ফিরতে পারলেই যেন বাঁচেন তিনি!
প্রথম ম্যাচে ৭ উইকেটের হার। গতকালও ১৬০ রানের বড় ব্যবধানে ভরাডুবি হয়েছে ক্যারিবীয়দের। ফলে টানা দুই হারে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে স্যামির দল পিছিয়ে ০-২তে। যদিও সংবাদ সম্মেলনে স্যামি আশা ছাড়েননি। বলেছেন, ‘২-০ ব্যবধান মানেই সব শেষ নয়।’ কিন্তু পরে যেভাবে প্রতিপক্ষের প্রশংসায় মাতলেন, তা যেন পরোক্ষভাবে বাঘ দেখারই নামান্তর! ‘ওরা (বাংলাদেশ) দারুণ খেলেছে। পরিকল্পনাগুলো কাজে লাগিয়ে দুটি মাচেই আমাদের উড়িয়ে দিয়েছে।’—বলেছেন স্যামি।
পুরো দল খেলেছে বাঘের মতো। ব্যাটিংয়ে আনামুল হক বিজয়কে দারুণভাবে সঙ্গ দিয়েছেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। আর বোলিংয়ে সোহাগ গাজী আর আবদুর রাজ্জাক কোনো সুযোগই দেননি প্রতিপক্ষকে। বিজয়ের অক্ষরে নাম লেখানো আনামুল হাফসেঞ্চুরি পূরণ করেন মাত্র ৬০ বলে। পরের ৫০ রান তুলেছেন ৭৮ বলে। ক্যারিয়ারে প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি পেয়েছেন ১৩৮ বল খেলে। আর তার ইনিংসে শেষ ২০ রান এসেছে মাত্র ৭ বলের কনকর্ডে চড়ে। এর মধ্যে পর পর ৬, ৪, ৬ মেরে আন্দ্রে রাসেলের ঘাড়টাও যেন মটকে দিলেন! সুনিল নারিনের হাতে ক্যাচ দিয়ে যখন বিজয় ফিরছেন, তখন তার নামের পাশে ১৪৫ বলে ১২০ রান। ইনিংসের পরতে পরতে ছড়ানো দৃষ্টিনন্দন ১৩টি চার, ২টি ছক্কার শিহরণ। বাংলাদেশও শুরুর ধাক্কা কাটিয়ে তরতরিয়ে অনেকটা এগিয়েও গেছে বাংলাদেশ—২/২১ থেকে ৩/১৯৫! রেকর্ডের পাতায়ও ততক্ষণে পড়েছে আঁচড়। ২০০৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে আশরাফুল-রাকিবুলের তোলা ১৪১ রান এত দিন ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় জুটির সর্বোচ্চ। এখন শীর্ষে বিজয়-মুশফিকুর জুটি—১৭৪ রান।
৩/১৯৫ থেকে ২৯২/৬-এ পৌঁছতে বাংলাদেশের খরচ হয় ৩ উইকেট। বিজয়ের আগেই বিদায় নেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। ওয়ানডের দ্বিতীয় হাফসেঞ্চুরি টাইগার দলপতিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। ৫৫ বলে হাফসেঞ্চুরি তুলে নিয়ে মুশফিক সে ডাকে সাড়া দেয়ার পথেই ছিলেন। কিন্তু মাঝপথে ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। রামপলের শর্ট বলে লেন্ডল সিমন্সকে ক্যাচ দিয়েছেন তিনি (৭৯)। মমিনুল হক যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন, গতিতারকা কেমার রোচহীন ক্যারিবীয় বোলিং লাইনআপকে রেখেছিলেন তোপের মুখে। দলীয় সঞ্চয়ে মমিনুলের অবদান ২৯ বলে ৩১ রানের ঝড়ো ইনিংস। আর শেষ দিকের ঝড়ে ১ চার ও ২ ছক্কায় মাশরাফি বিন মর্তুজা ১৮ রান তুললে ‘প্রাথমিক লক্ষ্য’ পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। আগের দিনের সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফিই বলেছিলেন, জয়ের জন্য ২৬০ থেকে ২৭০ রান চাই তাদের।
উইন্ডিজকে ২৯৩ রানের চ্যালেঞ্জিং টার্গেট দিয়ে ইচ্ছাপূরণের খেলায় মেতেছেন টাইগার বোলাররা। ক্যারিবীয় ব্যাটিং লাইনআপে প্রথম আঘাতটি সোহাগ গাজীর। দ্বিতীয়টি ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ মাশরাফির। আগের দিনের ধারাবাহিকতায় গতকালও গাজী স্পিন বিষে নীল করেছেন সিমন্স (৯), মারলন স্যামুয়েলস (১৬) ও নারিনকে (১০)। মাশরাফির শিকার মলিনতা কাটিয়ে ঝড়ের আভাস দেয়া মারকুটে ক্রিসগেইল (১৫)। আর বাঁহাতি স্পিনের থাবায় সফরকারীদের মিডল অর্ডার ধসিয়ে দিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক। ডোয়াইন স্মিথ, ডোয়াইন ব্রাভো ও থমাসের উইকেট নিয়েছেন তিনি।
টাইগারদের পেস-স্পিনের যুগলবন্দি আক্রমণে নিয়মিত উইকেট হারানো ক্যারিবীয়রা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ৬৩/৩ থেকে দলীয় সঞ্চয়ে ১০০ রান তুলতেই অধিনায়কসহ ৭ উইকেট হারায় তারা। সফরকারীদের সমতায় ফেরার স্বপ্ন আক্ষরিক অর্থে তখনই গুঁড়িয়ে যায়। শেষ দিকে স্যামির ডেপুটি কিয়েরন পোলার্ড মান বাঁচানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পার্টটাইমার নাঈম ইসলামের স্পিনের ভাষা বুঝতে পারেননি এ জ্যামাইকান। পোলার্ড বোল্ড হয়েছেন ব্যক্তিগত ২৫ রান তুলে।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাঘের থাবায় ক্ষতবিক্ষত হওয়া উইন্ডিজদের ইনিংসের প্রাণবায়ু ফুরিয়েছে ৩১.১ ওভারে ১৩২ রানে অল আউট হয়ে। তামিম (৫), নাঈম (৬), নাসিরকে (৪), মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে (৩*) বাঘের বেশে না পেলেও বিজয়, গাজী, রাজ্জাকের কল্যাণে স্যামির বাঘদর্শন হয়ে যায় ঠিকই!