সেচকাজে স্বাবলম্বী নারী

কয়েক বছরে দেশের কৃষিতে যে অগ্রগতি, তাতে বড় অবদান রয়েছে নারীর। পুরুষের পাশাপাশি তারা যেসব কাজে অংশ নিচ্ছেন, তার মধ্যে সেচ অন্যতম। বিপুলসংখ্যক নারী সরাসরি সেচ পরিচালনা করে এরই মধ্যে স্বাবলম্বী হয়েছেন। আসছে বোরো মৌসুমেও সেচের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলোর নারীরা।
বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যাদের নলকূপ নেই, তারাও এবারের বোরো আবাদে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে অংশ নেবেন। এমন প্রস্তুতিই নিচ্ছেন রংপুর শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে মিঠাপুকুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ফুলচৌকির নারীরা। বোরো আবাদ করে এখানকার অনেক নারীই এখন স্বাবলম্বী। দারিদ্র্যপীড়িত ফুলচৌকি গ্রামের চেহারাই পাল্টে দিয়েছেন তারা। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বোরো ধানের বীজতলা প্রস্তুতের কাজ। কয়েক বছর ধরে এখানকার নারীদের কেউ কেউ চরকা বা কুয়া থেকে বাঁশের সঙ্গে দড়ি বেঁধে বালতি ভরে বোরো ক্ষেতে পানি দিয়ে আসছেন। কেউবা পা-চালিত নলকূপ দিয়ে সেচ চালাচ্ছেন। এ পদ্ধতিতে নিজেদের জমি তো বটেই, অন্যের জমিতেও সেচ দিচ্ছেন। এতে আয় হচ্ছে প্রতিদিন ১৩০-১৭০ টাকা। তাদের দেখে পাশের গ্রামের নারীরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।
ফুলচৌকির লাভলী বেগম জানান, তারা এবার দুই বিঘা জমিতে কুয়ার পানি দিয়ে বোরো আবাদ করবেন। বীজতলা তৈরি হয়ে গেছে। তিনি একাই কয়েক দিন পর পর সকাল-বিকাল চরকা দিয়ে বীজতলায় পানি দিচ্ছেন। এ কাজে মাঝে মধ্যে স্বামীর সহায়তাও পাচ্ছেন তিনি।
জানা গেছে, দেশের অন্যতম সংগঠিত কৃষিপ্রধান এলাকা রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৬টি জেলায় ১৪ হাজার গভীর নলকূপের ৭ হাজার অর্থাৎ ৫০ শতাংশই সরাসরি পরিচালনা করছেন নারীরা। পুরুষদের নামে যেসব নলকূপ রয়েছে, তারও বেশির ভাগের পরিচালনায় রয়েছেন নারী। যেসব এলাকায় পাম্পের সুবিধা নেই, সেখানেও প্রাকৃতিক উপায়ে সেচ পরিচালনায় এগিয়ে এসেছেন তারাই। যশোর, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর, বরিশাল ও সাতক্ষীরায়ও এ কাজে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এসব অঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় মেয়েরা এনজিও কিংবা নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে সেচ যন্ত্র স্থাপন করছেন। সহজে অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এ ক্ষেত্রে তাদের উত্সাহ দিচ্ছে। এ কাজে পুরুষের তুলনায় নারীরা মুনাফাও করছেন বেশি।
এ বিষয়ে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডু বণিক বার্তাকে বলেন, এ এলাকার উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ অনস্বীকার্য। এ জন্য সেচসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকারও পেয়ে থাকেন। নলকূপ স্থাপন কিংবা পরিচালনায় পুরুষের তুলনায় নারীরা বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যাপারে বেশি সচেতন।
কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, দেশে ১৪ লাখের বেশি গভীর ও অগভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ডিজেলচালিত। বিদ্যুৎ চালিত নলকূপের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। প্রতি বছর বিদ্যুৎ চালিত নলকূপের জন্য আবেদন পড়ছে ২৫ হাজারেরও বেশি। পাশাপাশি ডিজেলচালিত পাম্পের বিক্রিও বাড়ছে। তবে পুরুষরা এসব নলকূপ কিনলেও পরিচালনার দায়িত্ব থাকছে নারীদের হাতেই। এ ছাড়া ভূমিহীন নারীরাও সেচকাজে নিয়োজিত হচ্ছেন। দেশের ভূমিহীন নারীদের ৬০-৭০ শতাংশই কৃষিকাজে সম্পৃক্ত। এদের অর্ধেক আবার সেচকাজে নিয়োজিত।
সেচকাজে নারীর সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তার ক্ষমতায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক সিমীন মাহমুদ। ‘উইমেন অ্যান্ড ওয়াটার পাম্পস ইন বাংলাদেশ: দি ইমপ্যাক্ট অব পার্টিসিপেশন ইন ইরিগেশন গ্রুপস অন উইমেন স্ট্যাটাস’ শীর্ষক গবেষণায় তিনি যেসব সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে আর্থিক ও পরিচালনা ঝুঁকি। স্বাধীনতার পর থেকে মূলত বিএডিসির অর্থায়নে শুধু পুরুষরা গভীর কিংবা অগভীর নলকূপ স্থাপনে অর্থায়ন সুবিধা পেতেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো এ কাজে এগিয়ে আসে। শুরুতেই তারা এ কাজে নারীকে অগ্রাধিকার দেয়। গ্রামীণ ব্যাংক, প্রশিকা, সপ্তগ্রাম, ও ব্র্যাকের অর্থায়নে উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলার নারীরা এ ক্ষেত্রে ভাগ্যোন্নয়নে সক্ষম হন। এটি এখন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেও বেশ কিছু সমস্যা রয়ে গেছে বলে মনে করেন সিমীন মাহমুদ। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের লিড রিসার্চার হিসেবে কাজ করছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভূমিহীন নারীরা অর্থসহায়তার মাধ্যমে পাম্প স্থাপন করলেও জমি না থাকায় সেচের পুরোটাই বিক্রি করতে হয়। সেচ পাম্প পরিচালনা, টাকা আদায়, রাত জেগে পানি দেয়া ছাড়াও বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে পুরুষের ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের। এ জন্য স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়াটা জরুরি। যারা সেটি করতে পারছেন, তারাই টিকে যাচ্ছেন।