দক্ষিণ এশিয়ার অগ্রগতির মডেল বাংলাদেশ দি ইকোনমিস্ট থেকে মুস্তাফা মাসুদ

ইটের ভাটা পেছনে ফেলে শিবালয় গ্রামের প্রান্তসীমায় পৌঁছাতেই গাড়ির গতি কমে এলোÑ একটি গরু রাস্তা পার হচ্ছে, তাকে যেতে দিতে হবে। এটি একটি শুভ লক্ষণ। বিশ বছর আগে ঢাকা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে কোনো ইটভাটা কিংবা অন্য কোনো শিল্পকারখানা ছিলো না; সেখানে ছিলো কিছু সংখ্যক গরু, কোনো গাড়ি ছিলো না। রাস্তা এতটাই সংকীর্ণ ছিলো যে, তার ওপর দিয়ে বাইসাইকেল ছাড়া আর কিছুই চলতে পারত না।
শিবালয়ে এখন প্রথম বারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু হয়েছে; বিশুদ্ধ পানির জন্য এখানে নলকূপ বসানো হচ্ছে, গ্রামের যুবকেরা তাদের মোটর সাইকেলগুলো চায়ের দোকানের পাশে রেখেছেÑ দেখতে বেশ লাগছে। একটি যৌথ পরিবারের কর্ত্রী রোমেজা বললেন: ‘‘আমি ১৭ বছর ধরে ক্ষুদ্রঋণের একজন গ্রাহক।’’ তিনি আরও বললেন: ‘‘আমি যখন শুরু করি তখন আমার ঘর ছিলো ভাঙ্গা; আমি রাস্তায় ঘুমোতাম। এখন আমার তিনটি গরু, এক একর জমি, ছাদের ওপর সৌরবিদ্যুতের প্যানেল এবং ৭৫ হাজার টাকার (৯২০ মার্কিন ডলার) ফিক্সট ডিপোজিট রয়েছে।
বাংলাদেশ ছিলো একটি ‘‘তলাবিহীন ঝুড়ি’’Ñএই অবমাননাকর অভিধায় প্রেসিডেন্ট হেনরি কিসিঞ্জারের স্টেট ডিপার্টমেন্ট সেইসব দেশকে আখ্যায়িত করত, যে-সব দেশ সর্বদাই বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলো। এদেশের জনগণ বন্যা ও সাইক্লোন-বিধ্বস্ত, নেই কোনো খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ। দেশটি ১৯৪৩ ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে, ১৯৭৫, ১৯৮২ এবং ২০০৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থান-সৃষ্ট কষ্ট ভোগ করেছে। ১৯৭১ সালে দেশটি যখন পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারবে কিনাÑ সে ব্যাপারে অনেক পর্যবেক্ষক সন্দিহান ছিলেন।
যারা বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও সামর্থ্য সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন, তারা প্রকারান্তরে সঠিক ছিলেন। ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত এখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিলো নগণ্য; দেশের রাজনীতি ছিলো অব্যাহতভাবে অস্থির। তৎসত্ত্বেও বিগত ২০ বছরেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশ তার জনগণের জীবনের মৌলিক ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বড় কৃতিত্ব অর্জন করেছেÑ যেমনটি অন্য কোথাও আর দেখা যায়নি।
১৯৯০ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ১০ বছর বেড়ে ৫৯ বছর থেকে ৬৯ বছরে উন্নীত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ভারতীয়দের চেয়ে ৪ বছর বেশিÑ যদিও ভারতীয়রা গড়ে দ্বিগুণ বেশি বিত্তশালী। এটিও অধিকতর লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশে ধনীদের মতো গরিবদের মধ্যেও প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধির হার বেশি।
বাংলাদেশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বিপুল অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০০৫ সালে ৯০ শতাংশেরও বেশি মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল, যা ছিলো ছেলেদের তুলনায় কিছুটা বেশি। এই হার ২০০০ সালের ছাত্রী ভর্তির তুলনায় ছিলো দ্বিগুণ। শিশু-মৃত্যুর হার এখন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে জন্মের সময় প্রতি হাজারে ৯৭ জনের মৃত্যু হতো, ২০১০ সালে তা ৩৭ জনে নেমে আসে। একই সময়ের মধ্যে শিশু-মৃত্যু দুই-তৃতীয়াংশ এবং মাতৃ-মৃত্যু তিন-চতুর্থাংশ কমে যায়। এখন অবস্থা এই যে, প্রতি এক লাখে মারা যায় গড়ে ১৯৪ জন। ১৯৯০ সালে নারীরা পুরুষের চেয়ে এক বছর কম বাঁচার আশা করত; এখন তারা পুরুষের চেয়ে দুই বছর বেশি বাঁচার প্রত্যাশা করে। ইতিহাসে মানবস্বাস্থ্যের উন্নয়নের সবচেয়ে নাটকীয় সময় হিসেবে সচরাচর অভিহিত করা হয় ঊনবিংশ শতকের শেষপাদে জাপানের মিজি ক্রান্তিতকালীন সময়ের উল্লেখযোগ্য আধুনিকায়নের সময়কে। বাংলাদেশের শিশু ও মাতৃমৃত্যুর বর্তমান রেকর্ড ওই সময়ের সাফল্যের সঙ্গে তুলনীয়।
এসব অগ্রগতি শুধুমাত্র জনগণের আয় বৃদ্ধির ফলশ্রুতি নয়। বাংলাদেশ একটি গরিব দেশ হিসেবে রয়ে গেছে, ক্রয়-ক্ষমতার মানদ-ে যার মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১,৯০০ মার্কিন ডলার।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিলো নগণ্যÑ বার্ষিক ২% মাত্র। ১৯৯০ সালের পর খেকে জিডিপি একটি সম্মানজনক পর্যায়েÑ বার্ষিক ৫%-এ উন্নীত হয়। এ অবস্থা দারিদ্র্য-সীমার নিচে বসবাসকারীদের হার কমাতে সহায়তা করেছেÑ ২০০০ সালের ৪৯% ২০১০ সালে ৩২%-এ নেমে এসেছে। এখনও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ভারতের তুলনায় কমÑ ভারতে বিগত ২০ বছরের মধ্যে অধিকাংশ বছরেই বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ শতাংশের মতো। তথাপি বাংলাদেশের উন্নয়ন-সাফল্য প্রশংসনীয়। এমন বিশ্বাস আছে যে, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িতÑ ‘‘ওয়াশিংটন ঐকমত্য’’-কে এই ভিত্তিতে প্রায়ই সমালোচনা করা হয় যে, কিছু দেশের প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক; কিন্তু দারিদ্র্য বিমোচনের হার নগণ্য। বাংলাদেশ এর বিপরীতটাই বাস্তবায়িত করেছে: সে তার প্রবৃদ্ধির পরিমাণের তুলনায় দারিদ্র্য বিমোচনের হার হ্রাস করেছে।

কিভাবে তা সম্ভব হয়েছে?

এই বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে রয়েছে চারটি অনুষঙ্গ। প্রথমত, পরিবার পরিকল্পনা মহিলাদের ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত করেছে। আপনি যদি শহর ছেড়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় যান, দেখতে পাবেনÑ বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। স্বাধীনতার পর পর দেশের নেতৃবৃন্দ অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন (চীনের এক সন্তান নীতি এবং ভারতের বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাত্বকরণ নীতিÑ দুটো ঘটনা মোটামুটি একই সময়ের)। সৌভাগ্যবশত, স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সরকার জবরদস্তিমূলক নীতি হ্রাস করেছিল। তার পরিবর্তে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে দেয়ার ব্যবস্থা করা হলো; সরকারী কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকরা জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি বিতরণ ও জনগণকে পরামর্শ দেয়ার জন্য সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লেন। ১৯৭৫ সালে সন্তান ধারণক্ষম ৮% নারী জন্মনিরোধক সামগ্রী ব্যবহার করছিল; ২০১০ সালে এই সংখ্যা ৬০%।
১৯৭৫ সালে সন্তান উৎপাদন ক্ষমতার মোট হার ছিলো ৬.৩। ১৯৯১ সালে তা ছিলো ৩.৪। উল্লিখিত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ২০০০ সালে সে এই নি¤œহার পুনরুদ্ধার করে। ইতিহাসের অন্যতম অতিমাত্রার অবনমনের পর সন্তান উৎপাদন ক্ষমতার হার এখন ¯্রফে ২.৩Ñ ‘‘প্রতিস্থাপন স্তরের’’ সামান্য ওপরে, যে পর্যায়ে গেলে জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যখন আলাদা হয়ে যায়, তখন তাদের প্রত্যেকের জনসংখ্যা সাড়ে ৬ কোটি বা তার কিছু বেশি ছিলো। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৫ কোটির ওপরে; পাকিস্তানের প্রায় ১৮ কোটি।
এ কারণে বাংলাদেশ ‘‘জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মুনাফা’’ অর্জনের দ্বারপ্রান্তে।
মহিলাদের উন্নততর স্বাস্থ্য ও অধিকতর কর্তৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা ছিলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর, যা তাদের বিপুল কল্যাণ সাধন করেছে এবং দারিদ্র্য নিরসনে অবদান রেখেছে। অন্যান্যের মধ্যে আরেকটি ফ্যাক্টর ছিলো প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার; স্কুলে বালিকাদের ভর্তির হার বালকদের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ২০ বছরেরও বেশি সময়ে বস্ত্রশিল্পের রমরমার কারণে এবং ক্ষুদ্রঋণের আবির্ভাবে মহিলাদের অর্থ আয়ের পথ সুগম হয়েছেÑ যা থেকে তারা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও উন্নততর খাদ্য বাবদ ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ গ্রামীণ জনগণের সাংসারিক উপার্জনের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিল, যা উন্নয়নশীল দেশসমূহে চরম দারিদ্র্য সম্প্রসারিত করে। ১৯৭১ ও ২০১০ সালের মধ্যে ধানের উৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; যদিও আবাদযোগ্য জমি বেড়েছে ১০ শতাংশেরও কম। সংকটের সময় একদা যে দেশ খাদ্য সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলো, সে দেশ এ বছর ছোট পরিসরে চাউল রফতানি করতে পারে। এক-ষষ্ঠাংশ জনগণ এখনও অপুষ্টির শিকার, যা হতাশাজনক। তথাপি ২০ বছর আগের চেয়ে এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে, যখন দেশের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ ছিলো কম ওজনের কিংবা খর্বকায়।
উৎপাদন-বৃত্তান্তই একমাত্র গল্প নয়। সবুজ বিপ্লবের নতুন ফসল ধান উৎপাদনকারীদেরকে উৎসাহিত করছে বছরে দু’বার ধান চাষ করার জন্য। গঙ্গা ব-দ্বীপের ধানের চাষ হয় বর্ষাকালে, যার নাম আমন ধান; এই ধান বোনা হয় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের আগে, আর ফসল কাটা হয় পরে। এখন বোরো ধান লাগানো হচ্ছে, আর ফসল তোলা হবে শীতকালে। দারিদ্র্য-সীমার ঠিক ওপরে যাদের অবস্থান, তারা ঘটনাক্রমে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হতে পারেন। এটি তাদের জন্য দৃশ্যমান আকস্মিক আঘাতÑ এসব ঘটনার মধ্যে থাকতে পারে অসুস্থতা কিংবা ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া। শীতকালীন ফসলের আবাদ সম্প্রসারিত করার মাধ্যমে উৎপাদিত বোরো ধান ফসল নষ্ট হওয়ার কারণে আকস্মিক আঘাত ও শোচনীয় দারিদ্র্যের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। ২০০৭ ও ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তিনটি বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সংকট এবং দুটি সাইক্লানের বিপর্যয় অতিক্রম করেছে। প্রায় প্রত্যেকেই আশংকা করেছিল যে, এর প্রভাবে দারিদ্র্য তীব্রতর হবে, কিন্তু তা হয়নি।
কৃষি ছাড়াও গ্রামের মানুষজনের হাতে অর্থকড়ি আসছে; আর অবশ্যই তা আসছে দেশের বাইরে থেকে। প্রায় ৬০ লক্ষ বাংলাদেশী বিদেশের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন, যার অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যে। তারা এক বিশাল অংকের রেমিট্যান্স জাতীয় আয়ের সাথে যোগ করছেন, যা অন্য যে কোনো বড় দেশের প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের চেয়ে বেশি। গত অর্থবছরের শেষে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; এটি বার্ষিক আয়ের প্রায় ১৪%Ñ সরকারের সবগুলো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয়িত অর্থের চেয়েও তা বেশি। প্রবাসীরা যে সকল গ্রাম থেকে বিদেশে কাজ করতে গিয়েছেন, তারা তাদের রেমিট্যান্স সে সব গ্রামে তাদের স্বজনদের কাছে পাঠাচ্ছেন। কারণ তারা অধিকাংশই তাদের কাজের মেয়াদশেষে গ্রামে নিজ নিজ পরিবারে ফিরে আসতে পছন্দ করেন, যে সকল পরিবার বিপুলভাবে উপকৃত হয়েছে। তবে এই অর্থাগমে গ্রামীণ কৃষি-মজুরির ওপর বড় প্রভাব পড়েছে, ভূমিহীন মজুরেরা বেশি মজুরি পেয়ে উপকৃত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০০০ থেকে ২০১০ সময়কালের হিসেব অনুযায়ী, এই দশ বছরে কৃষি-মজুরি বেড়েছে ৫৯%, যেখানে অন্য সকল সেক্টর মিলে বেড়েছে ৪২%। অধিকাংশ দেশে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যের কারণে গ্রামীণ জনগণের জীবনমানের অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশে তেমনটি হয়নি।
বার্লিনস্থ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘‘দুর্নীতির সূচক’’ অনুযায়ী ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০। বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচির ক্ষেত্রে ঐক্যমত্য রয়েছে। বেশিরভাগ নি¤œ আয়ের দেশ তাদের দরিদ্রদের সাহায্যের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশ তার চেয়ে কিছুটা বেশি ব্যয় করে। সরকারী ব্যয়ের প্রায় ১২ শতাংশ ( জিডিপির ১.৮ শতাংশ) অতি-দরিদ্রদের রক্ষার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় হয়। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), নগদ অর্থ প্রদান ও সরাসরি খাদ্য বিতরণÑ যে সব কর্মসূচি অধিকাংশ দরিদ্র দেশের নেই।
বলা হয়ে বাংলাদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে যে অর্থ ব্যয় করা হয় (শিক্ষাখাতে জিডিপির ২.২% ও স্বাস্থ্যখাতে ৩.৫%), নি¤œ-আয়ের দেশগুলোর জন্য তা অপর্যাপ্ত। তাছাড়া, প্রণোদনামূলক কাজে ব্যবহারের চেয়ে এই ব্যায়ের একটি বড় অংশ অপচয় করা হয়েছে। দেশে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা এনজিওগুলো অসাধারণ ভূমিকা পালন করছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের প্রধান রেহমান সোবহান বলেন যে, রাষ্ট্রের স্কুল, ক্লিনিক ও নগদ টাকা প্রদান স্কিম ব্যতীত অন্য হস্তক্ষেপগুলো কাজে আসবে না। এ কাজটিই এনজিওরা করে, দারিদ্র্যের সাথে অভিনব লড়াইয়ে যা বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছে।
ব্র্যাক বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ধারণার উদ্ভাবক। এটি হলো দুর্দশাগ্রস্তদের জন্য ছোট আকারের ঋণ। অন্য আরেকটি এনজিও হলো গ্রামীণ ব্যাংক, যারা দরিদ্র মহিলাদের নিয়ে কাজ করে। তারা ঋণগ্রহীতাদের নিয়ে সাপ্তাহিক সভায় মিলিত হয়Ñ যার সদস্যরা ঋণ পরিশোধে পিছিয়ে-থাকা সদস্যদের চিহ্নিত ও সহযোগিতা করে। তাদের অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের ৮.৪ মিলিয়ন ঋণগ্রহীতা রয়েছে এবং তাদের প্রদত্ত অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ব্র্যাকের রয়েছে ৫ মিলিয়ন ঋণগ্রহীতা আর তাদের প্রদত্ত অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ৭২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এ দুটি এনজিও প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্ষুদ্রঋণ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে। তাদের মুনাফার বিষয়টি একদিকে যেমন অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে তেমনি একে আক্রমণও করা হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণের নেতিবাচক দিক নিয়ে যা বলা হয় তা হলো, এই ঋণ উদ্যোগমূলক কর্মকা-কে উৎসাহিত করে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা ঋণগ্রহীতাদের আগের চেয়ে খারাপ অবস্থায় রেখেই কেটে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ রাজ্জাকের দৃষ্টিতে, জনগণের মধ্যে সমপরিমাণ আয় ও গৃহস্থালী সম্পদের অধিকারী দুই ধরনের মানুষ রয়েছে। এক গ্রুপ বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত ঋণ গ্রহণ করে। অন্য গ্রুপ, ক্ষুদ্রঋণ কোনো সাহায্য করে কিনা তা বোঝে না। ১৯৯৮ সালে প্রথম গ্রুপের মধ্যে বিদ্যমান দারিদ্র্যের হার ৭৮ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২০০৪ সালে ৬৮ শতাংশে নেমে আসে। দ্বিতীয় গ্রুপের মধ্যে দারিদ্র্যের হার তখনও কমেছিল, কিন্তু তা সর্বোচ্চ অর্ধেকমাত্রÑ ৭৫ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ৭০ শতাংশ।

জাদুকরী অনুষঙ্গ

শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও, ব্র্যাক এবং বিশেষভাবে এনজিওরা ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষুদ্র লগ্নিকারীর অর্থ বাংলাদেশের সত্যিকার জাদুমন্ত্র ছিলো না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর ব্র্যাক বাংলাদেশের পূর্বপ্রান্তের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরাসরি জরুরী ত্রাণ বিতরণ শুরু করে। কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং উপকারভোগীর সংখ্যার বিচারে এখন এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ এনজিও। গ্রামীণ ব্যাংকের মতো প্রধানত ক্ষুদ্র বিনিয়োগ ও সঞ্চয় কার্যক্রম গ্রহণ না করে ব্র্যাক বাস্তবিকপক্ষে সবকিছুই করছে। ১৯৮০-এর দশকে সংস্থাটি দেশের প্রতিটি বাড়িতে তার স্বেচ্ছাসেবকদের পাঠিয়েছিল কীভাবে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের পানিশূন্যতা রোধে যথাযথ অনুপাতে লবণ, চিনি ও পানির মিশ্রণে স্যালাইন তৈরি করা যায়, মায়েদের তা দেখাবার জন্য। সম্ভবত অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে এই উদ্যোগ দেশে শিশুমৃত্যুর হার কমাতে প্রভূত ভূমিকা রেখেছিল। ব্র্যাক ও সরকার যৌথভাবে প্রত্যেক বাংলাদেশীকে যক্ষা-প্রতিরোধক টিকা দেয়ার জন্য এক বিশাল কর্মসূচী পরিচালনা করেছিল। ব্র্যাকের প্রাইমারি স্কুল সরকারী স্কুল থেকে ঝরেপড়া শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়। এছাড়াও ব্র্যাকের রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ আইন-সহায়তা কর্মসূচী: বাংলাদেশের পুলিশ স্টেশন বা থানার চেয়ে ব্র্যাকের আইন-সহায়তা কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক বেশি।
ব্র্যাক হলো সামাজিক উন্নয়নে নিবেদিত একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠান। এটি ক্ষুদ্র কার্যক্রম নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল; কিন্তু এক সময় দেখল যে, তার দরিদ্র গ্রাহকরা তাদের ক্রয়কৃত গরুর দুধ আর হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করতে পারছে না। সুতরাং ব্র্যাক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কাজ শুরু করল। যখন দেখা গেল অধিকাংশ অতি-দরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণেও অসমর্থ, তখন একটি কর্মসূচীর মাধ্যমে তাদেরকে গবাদিপশু দেয়ার ব্যবস্থা করা হলো। ব্র্যাক এখন অনেকগুলো ডেয়ারি ফার্ম, একটি প্যাকেজিং ব্যবসায়, একটি উচ্চ ফলনশীল বীজ উৎপাদন কেন্দ্র, টেক্সটাইল প্লান্টসমূহ এবং এর মালিকানাধীন দোকানসমূহ পরিচালনা করছেÑ তেমনিভাবে ঝরে-পড়াদের জন্য স্কুল, ক্লিনিক এবং স্যানিটেশন প্লান্টসমূহ পরিচালনা করছে।
নবধারার এই এনজিওটির রয়েছে মোবাইল ফোনসহ ১ লক্ষ স্বেচ্ছাসেবিকা। একজন স্বেচ্ছাসেবিকা যখন দেখতে পান যে, কোনো মহিলা গর্ভবতী, তখন সেই হবু মাকে শিশুর জন্মপূর্ব এবং পরবর্তী স্বাস্থ্য পরিচর্যা সম্পর্কে বিস্তারিত পরামর্শ প্রদান করেন। এই কর্মসূচী প্রত্যন্ত গ্রাম-গ্রামান্তরে মা ও শিশুস্বাস্থ্য সংক্রান্ত নিবিড় প্রতিবেদন প্রণয়নে ব্র্যাককে সহায়তা করছে।

স্থিতিপত্র

বাংলাদেশে এখনও অনেক গুরুতর সমস্যা রয়েছে। জনগণের পুষ্টিমান অপ্রতুল দ্বিসহ¯্রাব্দের শুরুতে কয়েক বছর পুষ্টি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সরকার যখন স্কুলে ভর্তির হার বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, তখন শিক্ষার গুণগত মান নেমে গেছে; ঝরে-পড়ার হার নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে (মাত্র ৬০% শিক্ষার্থী প্রাইমারি শিক্ষা শেষ করতে পারে, আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে যা অনেক কম)। ১১ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ প্রয়োজনীয় সাক্ষরতা ও সংখ্যা গণনার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কিন্তু সার্বিকভাবে বাংলাদেশের সাফল্যের রেকর্ড সন্তোষজনক। নারী-উন্নয়নে দেশটির সাফল্য বিশাল। দেশের নাগরিকদের একথা বলা হয় যে, ¯্রফে দেশে কাজ না পাওয়ার ফলেই বিদেশে যেতে হচ্ছেÑ এটি যথার্থ নয়; বরং এর মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে। ভারতের পল্লীউন্নয়নমন্ত্রী জয়রাম রমেশ সম্প্রতি বলেছেন, ‘‘ বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, পরিবর্তনের লক্ষ্যে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আশায় আমাদেরকে অপেক্ষা করে থাকতে হবে না। শক্তিমান তৃণমূল প্রতিষ্ঠানসমূহ অনেক সাফল্য অর্জন করতে পারে, যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না।’’
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)