জেনেনিন ঃ থ্রি-জি কী?

বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে বাংলাদেশ তৃতীয় প্রজন্মের (থার্ড জেনারেশন-থ্রি-জি) প্রযুক্তিতে প্রবেশ করেছে। গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রযুক্তিটি উন্মুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হচ্ছে। অনেকেই জানেন না থ্রি-জি কি, এতে কি কি সুবিধা পাওয়া যাবে, বহির্বিশ্বে কবে থেকে থ্রি-জি চালু হলো এবং বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে থ্রি-জির অবস্থান কি? চলুন এসব প্রসঙ্গ জেনে নেয়া যাক।

থ্রিজি প্রযুক্তি কি?

আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন সংস্থা বা আইটিইউ এর সংজ্ঞানুসারে  Application services include wide-area wireless voice telephone, mobile Internet access, video calls and mobile TV, all in a mobile environment.থ্রিজিকে এক কথায় মোবাইল ভিডিও কল ও মোবাইল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ট্রান্সপোর্টার নেটওয়ার্কও বলা যেতে পারে।

থ্রিজি প্রযুক্তির সুবিধা : থ্রি-জির অনেক অনেক সুবিধা রয়েছে। এ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় সুবিধা হল এই প্রযুক্তি কার্যকর থাকলে মোবাইল হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে ভয়েস সুবিধার পাশাপাশি ব্যবহারকারীরা ভৌগোলিকভাবে যে অবস্থানেই থাকুক না কেন উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। গ্রামের অর্ধশিক্ষিত একজন মানুষ সবসময় সবখানে বসে সারাবিশ্বের সাথে যোগাযোগ এবং সব ধরনের তথ্য অতি সহজেই আদান-প্রদান করতে পারে। থ্রি-জি প্রযুক্তির মাধ্যমে টিভি দেখা, খেলা দেখা, ভিডিও ক্লিপস আদান-প্রদান সবই সম্ভব। একজন ব্যবহারকারী থ্রিজি সাপোর্টেড মোবাইল সেটের সাহায্যে ভিডিও কনফারেন্স করতে পারে। ভিডিও টেলিফোনি পাওয়ারফুল ক্যামেরা, ইমেজ এডিটিং, ব্লগিং, ভিডিও কল, মুভি ট্রান্সফার সবই সম্ভব। বিনোদনের ক্ষেত্রে এটি অদ্বিতীয়। মোবাইল হ্যান্ডসেটে ইন্টারনেটের গতি বাড়বে অন্তত দশগুণ। এখন যে কাজ করতে দশ মিনিট লাগে তখন সেটি হবে এক মিনিটে। থ্রিজি মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চ গতিতে তথ্য পরিবহন সম্ভব বলে জিপিএসের মাধ্যমে পথ নির্দেশনা পাওয়া, উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারসহ ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেওয়া যাবে। এছাড়া মোবাইল ফোনেই দেখা যাবে টেলিভিশন। যিনি মোবাইলে ফোন করেছেন তার ছবিও দেখা যাবে, জানা যাবে তার অবস্থান। থ্রিজি প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘরে বসেই সন্তানদের নিরাপত্তা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা যাবে। শহরের সব সড়কের গাড়ির গতিবিধি দেখে অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যাম নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে পুলিশ। থ্রিজি’র এমন হাজারও সুবিধা রয়েছে।

দেশে দেশে থ্রিজি : ১৯৭৯ সালে জাপানে প্রথম প্রজন্মের (১জি) মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপনের মাধ্যমে জেনারেশন প্রযুক্তির যাত্রা শুরু করে। এরপর ২০০১ সালের মে মাসে জাপান সরকার প্রথম সে দেশে এই ২.৫/২.৭৫ জি মোবাইল নেটওয়ার্ক আপগ্রেড করে থ্রিজি মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন করার অনুমতি দেয়া। পরবর্তী দুই তিন বছরের মধ্যেই ধনী দেশগুলোর সরকারের কাছ থেকে মোবাইল অপারেটরেরা তাদের নেটওয়ার্ক আপগ্রেড করার অনুমতি লাভ করে যা ২০০৬ থেকে ২০০৭ সালে এসে ৩.৫ জি বা ইউনিভার্সাল মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম হাই স্পিড ডাউনলিংক প্যাকেট এ্যাক্সেস-এ আপগ্রেড করেছে বলে অনেকে দাবি করছে। এছাড়া দুই একটি ধনী দেশ/অঞ্চল/শহর এরই মধ্যে ফোরজি নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে বলে শোনা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের মোবাইল কোন জেনারেশনের : থ্রি-জি হচ্ছে এই মোবাইল নেটওয়ার্কের ‘থার্ড জেনারেশন মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক’। বাংলাদেশের ব্যবহারকারীরা ২০১০ সালেও যে ধরনের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে, একে অন্তত দশ বছর আগের ২.৫জি/(জিপিআরএস-GPRS) বা ২.৭৫জি/(GREDGE) নেটওয়ার্ক দাবি করা হয়। সহজে নেটওয়ার্কের এই আপগ্রেডেশনকে এভাবে দেখা যায়, শুরুতে ২জি, ২.৫জি, ২.৭৫জি। GREDGE নেটওয়ার্ক আপগ্রেড করে থ্রিজি মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন করলে মৌলিক যে সুবিধাটি পাওয়া যায় তাহলো স্বল্পমূল্যে/গণতান্ত্রিকমূল্যে ও দেশের সকল জনগণকে সমান সুবিধা দিয়ে যেকোন অবস্থানে যেকোন নাগরিক হাইস্পিড এবং ম্যাসডাটা ট্রান্সপোর্ট করার সক্ষমতা অর্জন করবে।

থ্রিজি বাংলাদেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ট্রান্সপোর্টের একমাত্র সমাধান। আর ডিজিটাল বাংলাদেশ বললে প্রথমই যে প্রশ্নটা আসে তা হলো ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট। আমাদের বাস্তবতা হলো মোবাইল নেটওয়ার্ক ছাড়া অন্য কোন নেওয়ার্কে যে কোন লোকেশনে ব্রডব্যান্ড দেয়া আগামী প্রায় ১০০ বছরেও অবাস্তব। মোবাইল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিবহনের ক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ স্বরুপ কাজ করবে।

টেলিটকের থ্রিজি : বাংলাদেশে থ্রিজি নেটওয়ার্কের শুরুটা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান টেলিটক। এই নেটওয়ার্কের নানা সুবিধা টেলিটকের গ্রাহক সংখ্যা বাড়াতে সহায়ক হবে। থ্রিজি সেবা চালু হলে দেশের ব্যবহারকারীরা কথা বলার ক্ষেত্রে, টেলিফোনের ক্ষেত্রে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক নতুন জগতে প্রবেশ করল। ২১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (এক হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা) ব্যয়ে চীনা কোম্পানি সিএমইসি টেলিটকের থ্রিজি নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে। সারাদেশে নেটওয়ার্ক বিস্তারের কাজ করতে আরও এক বছর সময় লেগে যেতে পারে। তবে ঢাকায় নেটওয়ার্ক স্থাপন কাজ শেষ হয়েছে। নেটওয়ার্ক কতটা কার্যকর হয়েছে তা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে।

আপাতত যে সুবিধা পাওয়া যাবে : আপাতত শুধু রাজধানী ও আশপাশের গ্রাহকরা থ্রিজি সুবিধা পাবেন। প্রাথমিকভাবে ঢাকা শহরের ৪ লাখ গ্রাহক এই সুবিধা পাবেন। এ বছরের শেষ নাগাদ চট্টগ্রামে চালু করা হবে থ্রিজি। নেটওয়ার্ক সমপ্রসারণের কাজ শেষ হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ভয়েস কলের (শুধু কথা বলা) রেট এখন যা আছে থ্রিজিতেও তাই থাকবে বলে জানা গেছে।

টেলিটকের থ্রিজির সব সার্ভিসেই ১০ সেকেন্ড পালস সুবিধা থাকবে। আর প্রাথমিক ভাবে দেশের ৫টি টেলিভিশন চ্যানেল মোবাইল ফোনে দেখা যাবে। এগুলো হলো বিটিভি, সময় টিভি, জিটিভি (গাজী টিভি), আরটিভি ও মাইটিভি। থ্রি-জিতে কোনো কল ড্রাপ থাকবে না।

 

আরো জানতে হলে