পার্বত্য এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে সোয়া ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানের ১৪ লাখ লোকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সোয়া ৩০০ কোটি টাকার কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। তিন পার্বত্য জেলার ২৫ উপজেলার অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ও সাম্যতা অর্জনে মৌলিক সেবার মান বৃদ্ধি করা এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। জানা গেছে, এর আওতায় এ এলাকার ১১টি নৃগোষ্ঠীসহ দুর্গম এলাকার সুবিধাবঞ্চিতদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খাওয়ার পানি ও অন্যান্য সেবা দেয়া হবে। একইসঙ্গে এসব এলাকার মানুষজনের জীবন মান উন্নয়নে সাহায্য করা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে এ এলাকার ৫০০টি নতুন পাড়া কেন্দ্র নির্মাণ, পরিচালন সেবা, সার্ভে, দেড় লাখ শিশুকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়া এবং এক হাজার ২০০ পানির উৎস উন্নয়ন করা হবে। জানা গেছে, পার্বত্য অঞ্চলের ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার স্থানীয়ভাবে পাড়ায় (ছোট গ্রাম) বাস করা নৃগোষ্ঠী শহর এলকার চেয়ে সবদিকে বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। ভাষা সহজগম্য না হওয়া এবং তাদের বেশিরভাগ দুর্গম এলকায় বসবাসের কারণে তারা সরকারি সম্পদ ও সেবাসহ মৌলিক অধিকার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত এসব মানুষকে সেবার আওতায় আনতে ১৯৮৫ সালে প্রথম ‘পার্বত্য এলাকার সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৮৫-৯৫ সাল মেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের সাফল্য, প্রভাব ও গুরুত্ব বিবেচনা করে পরবর্তীতে প্রকল্পটির দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। ওই বছরের জানুয়ারি থেকে জুন ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ব্যয় হয় ২২৯ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে প্রায় ৭ লাখ লোককে সেবার আওতায় আনা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের ধারাবাহিকতা ও সাফল্যের পর ইউনিসেফ এতে অনুদান হিসেবে ২০ মিলয়ন মার্কিন ডলার প্রকল্প সহায়তা দিতে সম্মত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের কাজের লক্ষ্যে সরকার ইউনিসেফের অনুদান (২০ মিলিয়ন ডলার) ১৬৩ কোটি টাকা ও সরকারি তহবিল থেকে ১৫৭ কোটি টাকাসহ মোট ৩২০ কোটি টাকার এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। মেয়াদকাল জুলাই ২০১২ থেকে জুন ২০১৭। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৫০০টি নতুন পাড়া কেন্দ্র নির্মাণ, চার হাজার পাড়া কেন্দ্র নিয়মিত পরিচালনার মাধ্যমে এক লাখ ৬০ হাজার পরিবারকে মৌলিক সেবা প্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, উক্ত চার হাজার পাড়া কেন্দ্রে সার্বিক জরিপকাজ পরিচালনা, পাড়া কেন্দ্রের মাধ্যমে সরকারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন সেবার সুষম বিতরণ ও বণ্টন করা, ৩-৫ বছর বয়সী এক লাখ ৫২ হাজার শিশুকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণে উপযুক্ত করা, ৬ মাস থেকে অনূর্ধ্বর্ ৫ বছর বয়সী শিশু, ১৩ বছর থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরী, গর্ভবতী মহিলা, প্রসূতি মা, নববিবাহিতা মহিলাদের স্বাস্থ্য সেবা দান, এক বছর বয়সী এক লাখ ৬০ হাজার শিশুকে টিকা প্রদান করা, এসব এলাকার পানি সরবরাহে ৮০০টি পুরাতন পানির উৎস মেরামতসহ নতুন এক হাজার ২০০টি পানির উৎসের উন্নয়ন, ২০ হাজার স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা সরবরাহ ও স্থাপন প্রভৃতি। প্রকল্পটির ওপর গত ২৭ আগস্ট পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। পিইসি সভায় প্রকল্পের কয়েকটি খাতের ব্যয় পুনর্নির্ধারণ ও সরকারের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণতা উল্লেখ করার সুপারিশ করা হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম, পুষ্টি, স্যানিটেশন, শিশু সুরক্ষা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়াই হচ্ছে সরকারের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। একইসঙ্গে এই এলাকার মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। তাই প্রকল্পাটি ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের মতামত হচ্ছে- প্রকল্পটি অনগ্রসর এসব জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সাম্যতা অর্জনে সহায়ক হবে। পাশাপাশি তারা জীবনযাত্রার মৌলিক সেবার আওতায় আসবে।