বিদেশি সহায়তা এসেছে লক্ষ্যমাত্রার ৯৩ শতাংশ

গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার ৯৩ শতাংশ বিদেশি সাহায্য এসেছে। বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিদেশি সাহায্যের এই প্রবণতা সন্তোষজনক বলে মনে করেন সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা। কেননা, সাধারণত বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ভাব থাকলে সাহায্যগ্রহণকারী দেশগুলোতে সহায়তা কম আসে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট বিদেশি সাহায্য পাওয়া গেছে ২০৫ কোটি ডলার, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২১৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ শতাংশ সাহায্য কম পাওয়া গেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে সবচেয়ে কম সাহায্য এসেছিল। ওই বছরে বিদেশি সহায়তার পরিমাণ ছিল ১৭৭ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি সাহায্য দেয় বিশ্বব্যাংক। বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বড় অবকাঠামো উন্নয়নে সহজ শর্তে সহায়তা দেয় তারা। জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (২০০৯-১০) অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ বিদেশি সাহায্য এসেছিল। ওই অর্থবছরে ২১৬ কোটি ডলার বেশি বিদেশি সাহায্য পাওয়া গেছে। এর আগে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বিদেশি সাহায্যপ্রবাহের পরিমাণ ছিল ১৮৪ কোটি ডলার।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মাত্র দুই কোটি ৭০ লাখ ডলার বিদেশি সাহায্য এসেছিল। এর পর থেকে সাহায্যের পরিমাণ ক্রমে বাড়তে থাকে। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রতিশ্রুত সাহায্যের খুব কমই ছাড় হচ্ছে। যে কারণে পাইপলাইনে আটকে আছে বিপুল পরিমাণ সাহায্য। বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি ডলার সাহায্য জমে আছে। ব্যবহারের অদক্ষতা ও সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এর জন্য প্রধান কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছর বিশ্বব্যাংক ও এডিবি সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছে। অন্যদিকে, দ্বিপক্ষীয় দেশ হিসেবে জাপান থেকে সর্বোচ্চ সাহায্য এসেছে। বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০টি উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশকে সহায়তা দিচ্ছে। নিট হিসাব ধরলে গত অর্থবছরে সাহায্যপ্রাপ্তির পরিমাণ আরও কম হবে। কারণ, ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করতে হয়। গত অর্থবছরে প্রাপ্ত ২০৫ কোটি ডলারের বিপরীতে সরকারকে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৭৭ কোটি ডলার। ফলে নিট বা প্রকৃত সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২৮ কোটি ডলার। চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিদেশি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৯০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশে সাহায্য তিন খাতে আসে_ খাদ্য সাহায্য, প্রকল্প সাহায্য ও বাজেট সহায়তা। তবে বেশির ভাগ সাহায্য আসে প্রকল্প নামে। প্রকল্পের নামে যে সাহায্য গ্রহণ করা হয়, ওই অর্থ দিয়ে মূলত বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার অধীনে দুই শতাধিক উন্নয়ন প্রকল্প বিদেশি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। অন্যদিকে, খাদ্য সাহায্যদাতারা সরাসরি দেয় না। সমপরিমাণ অর্থের বিনিময়ে চাল ও গম দিয়ে থাকে। স্বাধীনতা-উত্তর যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ খাদ্য সহায়তা দিলেও এখন অস্ট্রেলিয়া ছাড়া অন্য কোনো দেশ বাংলাদেশকে খাদ্য সাহায্য দেয় না। একসময় বাংলাদেশ বিদেশি সাহায্য নির্ভরশীল ছিল। জাতীয় বাজেটের জন্য যে পরিমাণ সম্পদের জোগান দিতে হতো, তার অর্ধেকই আসত বিদেশি উৎস থেকে। এখন সেদিন পাল্টে গেছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়ায় বিদেশ নির্ভরশীলতা ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে।
সাহায্য নির্ভরশীলতা হ্রাস পেলেও এর কাঠামো বদলে গেছে। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, দাতারা তখন বেশি দিত অনুদান; ঋণের পরিমাণ ছিল খুবই কম। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রকাশিত হালনাগাদ ‘ফলো অব এক্সটারনাল রিসোর্স প্রতিবেদন’ থেকে দেখা গেছে, স্বাধীনতা-উত্তর দেশে প্রাপ্ত বিদেশি সাহায্যের ৯০ ভাগই ছিল অনুদান। এখন পুরো চিত্র উল্টো হয়ে গেছে। বর্তমানে যে পরিমাণ সাহায্য আসছে, তার বেশির ভাগই ঋণ। ঋণের বিপরীতে সরকারকে সুদ দিতে হচ্ছে, আবার ঋণ পেতে হলে দাতাদের নানা জটিল শর্ত আরোপ থাকে। কিন্তু অনুদানের ক্ষেত্রে কোনো দায়বদ্ধ নেই। কারণ, অনুদান ফেরত দিতে হয় না। বিদেশি সাহায্যের ক্ষেত্রে ঋণের অংশ বাড়ায় সরকারের ওপর সুদের বোঝা বাড়ছে দিন দিন।