দেশের একমাত্র ও এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের যাত্রা শুরু

দেশের একমাত্র ও এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স এন্ড হসপিটাল’র যাত্রা শুরু হল। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত তিনশ শয্যার এই হাসপাতালের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমানে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিত্সা সেবা চালু রয়েছে। শিগগিরই রোগী ভর্তি ও অপারেশন শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম।নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সকলের অক্লান্ত পরিশ্রমে ২৪ পৃষ্ঠার পর

এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নিউরোলজি রোগীদের চিকিত্সার পাশাপাশি এই সেক্টরে অভিজ্ঞ জনবলও তৈরি করা সম্ভব হবে। এই জনবল দেশের সরকারি হাসপাতালসমূহে পরবর্তীতে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। ফলে গ্রামাঞ্চলের রোগীদের আর ঢাকায় আসার প্রয়োজন পড়বে না।

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, এটি একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ মাথায় গুরুতর আঘাত পান। এই সকল আহতের মধ্যে ৯০ ভাগের জরুরি অপারেশন প্রয়োজন হয়। সময়মত অপারেশন না করায় সিংহভাগ রোগীই মারা যান। এসব রোগীকে এই হাসপাতালে জরুরি চিকিত্সা দেয়া যাবে। এছাড়া আমাদের দেশে ঘরে ঘরে মাথা ব্যথার রোগী রয়েছে। এক লাখ লোকের মধ্যে প্রায় ৩শ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। অনেকে প্যারালাইসড হয়ে যান। মৃগী ও ব্রেন টিউমারের রোগীও বাড়ছে। আক্রান্ত হওয়ার ৬ ঘণ্টার মধ্যে এই হাসপাতালে পৌঁছালে চিকিত্সা পাওয়ার পর রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারবেন বলে তারা দাবি করেন।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে গিয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা গেছে। সেখানে কর্তব্যরত কর্মকর্তা ও ডাক্তারদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, ১৯৯৮ সালে সোসাইটি অব নিউরো সায়েন্সের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল তত্কালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ সেলিমের সঙ্গে দেখা করে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ নিউরো চিকিত্সা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়ে হাসাপাতালের কার্যক্রম শুরু করে। আগারগাঁওয়ে তিন একর জায়গায় তিনশ বেডের নিউরো সায়েন্স হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে পর্যায়ক্রমে এটি ৫শ বেডে উন্নীত করা যাবে। সরকারি খাত থেকে ২৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯ তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণ এবং যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়। এর মধ্যে ১২১ কোটি টাকায় জার্মানি থেকে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। হাসপাতাল ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে একশ গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। হাসপাতাল ভবনের পাশে জরুরি সার্ভিসে নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীদের জন্য ৬ তলা বিশিষ্ট ৪টি ডরমেটরি নির্মাণ করা হয়েছে। হাসপাতালে ৮টি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার ও পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এনজিওগ্রাম, সিটি স্ক্যান ও এমআরআই মেশিনসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সর্বাধুনিক মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। শুধু অজ্ঞানকারী চিকিত্সক নিয়োগ হলেই অপারেশন চালু করা সম্ভব। তবে গতকাল পর্যন্ত কোন অজ্ঞানকারী চিকিত্সক মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ দেয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই দেশে পূর্ণাঙ্গ নিউরোলজী ও নিউরো সার্জারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন। এবার ক্ষমতায় এসে সরকারি অর্থায়নে সফলভাবে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে সফলভাবে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নিউরোলজী ও সার্জারি রোগীদের চিকিত্সা সেবা নিয়ে ভোগান্তি অনেক গুণ কমে যাবে।

সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকরা জানান, দেশে নিউরোলজী ও নিউরো সার্জারি চিকিত্সা সুবিধা চাহিদার তুলনায় সীমিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজী ও নিউরো সার্জারি বিভাগের বাইরে সরকারিভাবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালে এই চিকিত্সা সুবিধা রয়েছে। সারাদেশের রোগী ওই হাসপাতালে এসে ভিড় জমান। মাথায় আঘাত নিয়ে দৈনিক ২০ থেকে ৫০ জন রোগী ওই হাসপাতালে আসেন। মাঝে মাঝে বড় বড় দুর্ঘটনায় এক সঙ্গে অর্ধশতাধিক রোগীও নিউরো সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি হন। ঐ সময় সীমিত ব্যবস্থা ও জনবলের কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিত্সা এবং তাত্ক্ষণিক অপারেশন নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সময়মত অপারেশন কিংবা চিকিত্সার অভাবে অনেকের মৃত্যু ঘটে। এছাড়া মাথায় টিউমার কিংবা অন্যান্য জটিল অপারেশনের জন্য অনেক সময় রোগীদের তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়। এই বিলম্বের কারণে রোগীদের অন্ধত্ব, প্যারালাইসিসসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। সরকারিভাবে এই অত্যাধুনিক পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দরিদ্র রোগীরাই বেশি উপকৃত হবেন বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান। প্রসঙ্গত, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সীমিত পরিসরে নিউরোলজী চিকিত্সার ব্যবস্থা রয়েছে।