হাতে স্টিয়ারিং, চোখে স্বপ্ন

বাংলাদেশে আর কোনো সড়ক দুর্ঘটনা হবে না! চমকে গেলেন এটি শুনে? কিন্তু ২১ জন নারী এ প্রত্যয় নিয়েই শিখছেন গাড়ি চালনা। ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে মাইক্রোবাস, বাস ও ট্রাকের চালক হিসেবে তাঁদের দেখা যাবে রাস্তায়। তাঁরা সবাই ভালো চালক হতে চান। যেন তাঁদের দ্বারা কারও জীবন সংশয় না হয়।

বলছিলাম ব্র্যাক সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের কথা। যাঁরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। এই ২১ জন নারী কোনো না কোনোভাবে আগে থেকেই বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সঙ্গে জড়িত। কেউ ছিলেন ব্র্যাক স্কুলের ছাত্রী, কেউ ব্র্যাক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউবা ছিলেন কিশোরী ক্লাবের সদস্য। গাড়ি চালনায় প্রশিক্ষণ নিতে আসার সময় কম-বেশি বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। কখনো পরিবার, কখনোবা সমাজের অন্যদের থেকে। সেসব বাধা অগ্রাহ্য করে তাঁরা এসেছেন। সবার লক্ষ্যও প্রায় একই, পরিবারের আর্থিক কষ্ট দূর করা, সন্তান ও ভাইবোনদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। জানা গেল তাঁদের কাছ থেকেই।
রাজশাহীর সুমি খাতুন মনে করেন নারী-পুরুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। ছেলেরা যা পারবে মেয়েরাও সেসব কাজ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারবে। দরকার সাহস। ‘আমি কারও ওপর নির্ভরশীল হতে চাই না। বরং সংসারের দায়িত্ব নিতে চাই। ভাইবোনদের লেখাপড়া শেখাতে চাই।’

মিনতি প্রভা চাকমা রাঙামাটি থেকে এসেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে চাকমা সম্প্রদায় থেকে তিনিই প্রথম নারী গাড়িচালক হতে যাচ্ছেন। ‘গ্রামের সবাই আমাকে নিয়ে খুব গর্বিত। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল নিজে কিছু একটা করব। বৈধ লাইসেন্স পেয়ে মাইক্রোবাস চালাব। তবে তা ঢাকায় নয়, রাঙামাটির উঁচু-নিচু পথে।’
মেয়েকে প্রকৌশলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান আফসানা মিমি। ‘অনেক আর্থিক কষ্টের মধ্যে আছে আমার পরিবার। আমি চাই পরিবারে সচ্ছলতা আসুক। গাড়ি চালানোর সময় শুধু নিজেকে নয়, মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে ধৈর্যসহকারে গাড়ি চালাব। সব সময় চেষ্টা থাকবে যাতে আমার জন্য অন্য কোনো পরিবারে দুর্ভোগ না আসে।’

গত বছর সরকারের জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবং বিআরটিএর দিকনির্দেশনায় ব্র্যাক নারী গাড়িচালক প্রশিক্ষণের এ প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং বাংলায় প্রশিক্ষণ উপকরণ তৈরিতে হিউবার্ট এবনার প্রাইভেট লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এটি দিল্লিভিত্তিক একটি ইন্দো-অস্ট্রিয়ান প্রতিষ্ঠান।

ব্র্যাক সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ নাজমুল হুসেইন বলেন, ‘যদি আমরা এ প্রকল্প চালিয়ে যেতে পারি তা হলে বাংলাদেশের রাস্তায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাবে। কারণ মেয়েরা সহজে অধৈর্য হয় না। ওভারটেক করার প্রবণতা থাকবে না। প্রশিক্ষণ শেষে আমরা ওদের চাকরির জন্য সহায়তা করব। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ওরা চাকরি করতে পারবে। আগ্রহীরা এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে অথবা ওদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারবে।’
এ বছরের ১৪ জুলাই থেকে শুরু হয়েছিল এই কর্মসূচি। দুই মাসের এ প্রশিক্ষণ এখন প্রায় শেষের দিকে। তবে ২১ জনেই থেমে থাকবে না প্রকল্পটি। ৬০০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে দেশের বাইরেও পাঠানো হবে। এ জন্য তাঁদের ইংরেজির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এখন অপেক্ষা এ মাসের ১৫ তারিখের জন্য। এ দিন তাঁদের পরীক্ষা নেওয়া হবে বৈধ লাইসেন্সের জন্য। এরপর শুধুই সামনে এগিয়ে চলা।