ইন্সতিতুত দ্য ফ্রাঁস-এর ‘ক্রিস্তোফ মেরো পুরস্কার ২০১২’ লাভ করেন আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী

সম্প্রতি ইন্সতিতুত দ্য ফ্রাঁস-এর ‘ক্রিস্তোফ মেরো পুরস্কার ২০১২’ লাভ করেন আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী। অভিনন্দন তাঁকে। ২ সেপ্টেম্বর আইসিডিডিআরবির নিজ কক্ষে বসে জানান পুরস্কারপ্রাপ্তির অভিজ্ঞতা।

২ এপ্রিল (২০১২) দিনটা শুরু হয়েছিল অন্য সব দিনের মতোই। কিন্তু একটি ই-মেইল বদলে দিল দিনটাকে। সেদিন অপার এক আনন্দ অনুভব করেছেন ফিরদৌসী কাদরী। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সেন্টার ফর ভ্যাকসিন সায়েন্সেসের পরিচালক তিনি। এ ছাড়া আইসিডিডিআরবির এনটেরিক ভ্যাকসিন ও ইমিউনোলজি ল্যাবরেটরি বিভাগের প্রধান। জ্যেষ্ঠ এই বিজ্ঞানী এ বছর ইন্সতিতুত দ্য ফ্রাঁস থেকে ক্রিস্তোফ রুডলফ ফাউন্ডেশনের ‘ক্রিস্তোফ মেরো পুরস্কার ২০১২’ লাভ করেন। ফিরদৌসী কাদরী শুধু প্রথম বাংলাদেশি নন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এই পুরস্কার অর্জন করেছেন।
‘এ বছরের ২ এপ্রিল সকালে একটা কাজে বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, সময় যেহেতু আছে, গাড়িতে বসে ই-মেইলগুলো দেখি। হঠাৎ একটা ই-মেইলে চোখ আটকে গেল। লেখা—ইউ হ্যাভ গট এ প্রাইজ। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার স্বামী, ছেলেমেয়েদের ই-মেইলটা পাঠালাম। আইসিডিডিআরবির আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করলাম। তিনি মনে হয় বিষয়টি জানতেন। তিনি বললেন, “আপনি ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।” ফোন করার পর তাঁরা জানালেন, মার্চেই আমি নির্বাচিত হয়েছি। সে সময় আমাকে ই-মেইল করা হয়েছে। আমার কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে তাঁরা আবার জানিয়েছেন। সেই মুহূর্তে কতটা ভালো লেগেছিল, বোঝাতে পারব না। কাজের স্বীকৃতি ও সম্মান একই সঙ্গে পাওয়ার অনুভূতি যেন পেলাম। মনে হলো দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। এখান থেকে শুরু হবে স্বপ্ন পূরণের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ৬ জুন ফ্রান্সে পরিবারের সঙ্গে গিয়ে পুরস্কার নিয়ে আসি। সত্যিই এই ভালো লাগা ভোলার নয়।’
২০০৭ সাল থেকে ইন্সতিতুত দ্য ফ্রাঁস ক্রিস্তোফ রুডলফ ফাউন্ডেশনের ‘ক্রিস্তোফ মেরো পুরস্কার’ চালু করে। তবে চূড়ান্ত নির্বাচনের কাজটি করে ফরাসি বিজ্ঞান একাডেমি। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংক্রামক ব্যাধির প্রতিষেধক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা গবেষণা করছেন, তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা যেন তাঁদের গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন, সে বিষয়েও সহায়তা করে থাকে ক্রিস্তোফ রুডলফ ফাউন্ডেশন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগ থেকে সম্মান ও স্নাতক—দুটোতেই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন। এরপর যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন তিনি। লেখাপড়া শেষে ফিরে আসেন দেশে। ‘কখনো বিদেশে থেকে যাওয়ার কথা ভাবিনি। দেশে এসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। এরপর ১৯৮৮ সালে যোগ দিই আইসিডিডিআরবিতে। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, মেয়েরা ঠিকমতো গবেষণার কাজ পারবে না। সেই ধারণা যে ভুল ছিল, তা প্রমাণ করতে হয়েছে। এখানকার গবেষণাস্তরের প্রতিটি ধাপে মেয়েরা কাজ করছে। আর আমি যখন আইসিডিডিআরবির দরজা দিয়ে প্রবেশ করি, তখন পৃথিবীর অন্য সবকিছু ভুলে যাই। গবেষণা তো মনের সুখেই করি, কাজ ছাড়া আর কী করার আছে জীবনে? আইসিডিডিআরবিতে গবেষণার জন্য অনেক সুযোগ রয়েছে। শুধু দেশের নয়, বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীরা এখানে কাজ করতে আসেন। পারস্পরিক মতামত, তথ্য ও জ্ঞানের বিনিময় হয়, এতেই তো উদ্ভাবন নতুন মাত্রা পায়।’ বলেন ফিরদৌসী কাদরী।
বর্তমানে তিনি কলেরা নিরাময়ে নতুন ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছেন। ইমিউনোলজি ল্যাবরেটরিতে তাঁর অধীনে প্রায় ২৫০ জন গবেষণার কাজ করেন।
‘আমরা সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে একটি কাজ করছি। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি—ইপিআই ও আইসিডিডিআরবি মিলে মিরপুরের সব বয়সের প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার জনকে কলেরার ভ্যাকসিন খাওয়ানো হয়েছে। আগামী বছর এর ফলাফল পাওয়া যাবে। তবে তাদের কারও শরীর শতভাগ কলেরা প্রতিরোধ করতে পারবে, কারও শতভাগ না হলেও সন্তোষজনক হারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠবে। আরেকটি বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি, ভালোভাবে হাত ধুয়ে খাওয়া ও নিরাপদ পানি যেন সবাই পান করে। এসব না মানার কারণে অনেক বেশি অসুস্থ থাকি আমরা। এ ছাড়া গবেষণা করি শিশুদের ওপর। বিদেশের শিশুদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, অপুষ্টির কারণে আমাদের দেশের শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। ফলে সহজেই তাদের শরীরে জীবাণু সংক্রমণ হয়। কীভাবে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায়, এর জন্য কোনো প্রতিষেধক ব্যবহার করা যেতে পারে, সেসব নিয়ে কাজ করছি।’
ফিরদৌসী কাদরী বলেন, ‘আমি মূলত ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করি। কীভাবে এরা মানুষ, বিশেষ করে শিশুকে সংক্রমণ করছে, কীভাবে এদের প্রতিরোধ করা যায়, কোন কোন প্রতিষেধক ভ্যাকসিন খেলে খাদ্যনালিতে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধক কোষ, অ্যান্টিবডি তৈরি হবে—এসব বিষয়ে গবেষণা করে থাকি। সংক্রামক ব্যাধি খাওয়ার মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এসবের কারণে সারা বছর ধরে মানুষ অসুস্থ থাকে। বিদেশে টাইফয়েড, কলেরা, ডায়রিয়া ও রোটা ভাইরাসের ভ্যাকসিন (টিকা) পাওয়া যায়। আমাদের দেশে এগুলো আনতে চাই। কেননা, এ দেশে এসব প্রতিষেধক সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য করতে পারলে এসব সংক্রামক রোগ থেকে মুক্তি ঘটবে।’
আজ এই সম্মান পাওয়ার পেছনে সবচেয়ে অবদান পরিবারের— এমনটাই মনে করেন ফিরদৌসী কাদরী। স্বামী সৈয়দ সালেহীন কাদরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক। ‘আমার মা নওশাবা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ছিলেন। আমার জীবনে তাঁর অনেক প্রভাব। ভীষণ খুশি হয়েছেন এই পুরস্কার অর্জনে। বিয়ের পর স্বামী সব সময় অনুপ্রাণিত ও সহযোগিতা করেছেন। আর আমার তিন সন্তানও আমাকে খুব উৎসাহ দেয়। এই পুরস্কারের পাঁচ লাখ ইউরো আমি নিজের জন্য না রেখে গবেষণার কাজে ব্যবহার করব, তাতে তাঁদের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই।’
বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরীর স্বপ্ন এখন আইদেশিকে (ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভ) ঘিরে। এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানের নানামুখী গবেষণা হবে। নতুন নতুন প্রতিষেধক উদ্ভাবন করা হবে, যাতে দেশের মানুষ সুস্থ থাকে। দেশকে যে তাঁর এখনো অনেক কিছু দেওয়ার আছে।
অর্জন
২০০৬
 জীববিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির স্বর্ণপদক প্রাপ্তি।
 ইনফেকশাস ডিজিজেস সোসাইটি অব আমেরিকার (এফআইডিএসএ) ফেলো।
২০১০
 বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো।
 আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজির ‘মজিলো ক্যাচিয়ার পুরস্কার’ অর্জন।
২০১২ 
 একাডেমি অব ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ডের (টয়াস) ফেলো নির্বাচিত।
 আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) শ্রেষ্ঠ নারীকর্মীর স্বীকৃতি অর্জন।
 আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজির বাংলাদেশে দূত নিযুক্ত।
 ইন্সতিতুত দ্য ফ্রাঁস ‘ক্রিস্তোফ মেরো পুরস্কার ২০১২’ প্রাপ্তি।