ইচ্ছাশক্তিই তাঁর বড় শক্তি

‘আমার জীবনের দুঃস্বপ্নগুলোকে ছাপিয়ে স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। আমি ভবিষ্যতে আইনজীবী হতে চাই। কারণ, আমার মতো নির্যাতিত হাওয়াদের সংখ্যা এ সমাজে অনেক। তাদের পাশে আমি দাঁড়াতে চাই।’ বলছিলেন স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার কারণে আঙুল হারানোর শিকার হাওয়া আক্তার।
নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেন হাওয়া। কিন্তু আঙুলহীন হাতে লেখার গতি কম হওয়ায় সাহায্যকারী শ্রুতিলেখক হিসেবে খালাতো বোন সানিয়া সুলতানাকে নিয়ে পরীক্ষাগুলো দেন। সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এ গ্রেড (জিপিএ ৪ দশমিক ৩) পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন হাওয়া। প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনো বাধাই প্রতিবন্ধক নয়। দৃঢ়চেতা মনোবলই তাঁকে জয়ী করেছে। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি জয়ী হয়েছেন। সমন্বয় ঘটিয়েছেন প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির।

হাওয়া আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো কাজের আগে ইচ্ছাশক্তিটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিনিস। এর বড় প্রমাণ আমি নিজে। দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের কারণে আজকে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় আত্মবিশ্বাস থাকলে আমার মতো হাওয়াদের জয় হবেই হবে। পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করছি। রেজাল্ট নিয়ে অনেক ভয়ের মধ্যে ছিলাম। কারণ, আমি নিজে লিখে পরীক্ষা দিতে পারি নাই। তবে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি যে তিনি আমাকে ভালোভাবে পরীক্ষায় পাস করিয়েছেন। তবে মনে হচ্ছে, আমি নিজের হাতে লিখতে পারলে হয়তো জিপিএ-৫ পাইতাম। আমি সারা জীবনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকব আমার খালাতো বোন সানিয়ার কাছে। কারণ, তার সহযোগিতায় আমি পরীক্ষা দিতে পেরেছি।’

হাওয়ার খালাতো বোন সানিয়া সুলতানা বলেন, ‘হাওয়া আপুর পরীক্ষা আমার হাত দিয়ে লিখেছি। আপুর যুদ্ধের সহযোদ্ধা আমি নিজেও। আপু যে ফলাফল করছে, সেটা আমারও ফলাফল। খুব ভালো লাগছে আপুর যুদ্ধের সঙ্গী হয়ে জয়ী হতে পেরে।’

হাওয়ার সহপাঠী নরসিংদী সরকারি কলেজর শিক্ষার্থী সুমা আক্তার বলেন, ‘হাওয়া আমাদের গর্ব। আমাদের দেশে অনেক নির্যাতিত মেয়ে আছে, যারা তাঁর দিকে তাকিয়ে সব প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত হবে বলে আমি মনে করছি।’

হাওয়ার দূরসম্পর্কের চাচি ও প্রতিবেশী ফারজানা আক্তার বলেন, ‘হাওয়া আমার দেখা সবচেয়ে ধৈর্যশীল মেয়ে। হাতের আঙুল হারানোর আগে সে অনেক চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। কিন্তু আঙুল হারানোর পর তার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল, এখন আবার উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি— সবকিছুই যেন বিস্ময়কর।’

হাওয়ার ফলাফলকে লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে উল্লেখ করে নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘হাওয়ার পরীক্ষা দেওয়া, ভালো রেজাল্ট করা—সবকিছুই ছিল স্বপ্নের মতো। কারণ, হাওয়া যে পরিস্থিতিতে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আজ যে ফলাফল করেছে, তা প্রশংসনীয়। সে তার স্বপ্নপূরণে বদ্ধপরিকর। বড় হয়ে সে আইনজীবী হতে চায়। আজকের এ ফলাফল হাওয়া তার স্বপ্নপূরণের সিঁড়িতে আরেক ধাপ এগিয়ে গেছে। এখন আমাদের সবার উচিত তার স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়িত করতে এগিয়ে আসা।’

হাওয়া আক্তারের মা পারভীন বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার হাওয়া যে অবস্থায় পরীক্ষা দেওয়ার সাহস করছে, আবার এ গ্রেড পাইয়া পাসও করছে, তাতে আমাগো কোনো অবদান নাই। সে তার নিজের গরজে সবকিছু করছে। আমরা তারে নিয়া অনেক খুশি। এহন সে উকিল (আইনজীবী) হইতে চায়। কিন্তু এত দিন তো কোনো রকম লেহাপড়া করাইতে পারছি। কিন্তু উকিল হইতে অনেক টাকার বিষয়। বুইঝা উঠতে পারতাছি না।’

২০০৮ সালের ৩০ জানুয়ারি সদর উপজেলার ভেলানগর এলাকার হাওয়ার সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নূরজাহানপুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের বিয়ে হয়। লেখাপড়ার প্রতি হাওয়ার প্রবল আগ্রহ থাকলেও রফিকুল চাননি তাঁর স্ত্রী পড়াশোনা করুক। তাই রফিকুল দুবাই চলে যাওয়ার পর তাঁকে না জানিয়েই কলেজে ভর্তি হন হাওয়া।
কলেজে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার খবর শুনেই ক্ষিপ্ত হন রফিকুল। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর রফিকুল দেশে ফিরে ঢাকার জিয়া কলোনিতে তাঁর বোনের বাসায় চাপাতি দিয়ে হাওয়ার ডান হাতের চারটি আঙুল কেটে নেন। এ ঘটনায় হাওয়ার বাবা ইউনুছ মিয়া ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা করেন। পরে পুলিশ রফিকুলকে গ্রেপ্তার করে। রফিকুল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। মামলাটি ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।